রাঙ্গামাটির সীতাঘাট মন্দিরের নির্মাণকাজ বন্ধ, বন বিভাগের বিরুদ্ধে বৈষম্যের অভিযোগ
নিজস্ব প্রতিবেদক
- প্রকাশিত : ২৮ জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
মো: সুমন খান, রাঙ্গামাটি প্রতিনিধি :
রাঙ্গামাটির কাপ্তাই উপজেলার ঐতিহাসিক সীতাঘাট মন্দিরের ভবন নির্মাণকাজে বাধা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে পার্বত্য চট্টগ্রাম দক্ষিণ বন বিভাগের বিরুদ্ধে। প্রায় তিন বছর ধরে চলমান প্রকল্পের কাজ শেষ পর্যায়ে এসে বন্ধ হয়ে যাওয়ায় স্থানীয় সনাতনী সম্প্রদায়ের মধ্যে ক্ষোভ ও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। তবে বন বিভাগ বলছে, সংরক্ষিত বনাঞ্চলে কোনো ধরনের স্থাপনা নির্মাণের অনুমতি নেই।
জানা গেছে, রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের অর্থায়নে ২০২২-২৩ অর্থবছরে প্রায় এক কোটি টাকা ব্যয়ে তিন বছর মেয়াদি প্রকল্প হিসেবে মন্দির ভবনের নির্মাণকাজ শুরু হয়। ইতোমধ্যে প্রকল্পের প্রায় ৬০ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হয়েছে। কিন্তু সম্প্রতি পার্বত্য চট্টগ্রাম দক্ষিণ বন বিভাগের আওতাধীন কাপ্তাই বন বিভাগ নির্মাণকাজ বন্ধ করে দেয়।
স্থানীয়দের অভিযোগ, একই এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে সীতাঘাট মন্দির, নাটমন্দির, শিবমন্দির ও গঙ্গা মন্দিরসহ একাধিক স্থাপনা রয়েছে। তাই নতুন ভবন নির্মাণে আপত্তির যৌক্তিকতা নিয়ে তারা প্রশ্ন তুলেছেন। তাদের দাবি, সরকার উন্নয়ন কর্মকাণ্ডকে উৎসাহিত করলেও বন বিভাগের এ সিদ্ধান্তে সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হতে পারে।
সীতাঘাট মন্দিরের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ শ্রীমৎ স্বামী জ্যোতির্ময়ানন্দ জানান, প্রায় ২৬ বছর আগে মন্দিরটি প্রতিষ্ঠিত হয় এবং এটি দীর্ঘদিন ধরে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের একটি গুরুত্বপূর্ণ তীর্থস্থান হিসেবে পরিচিত। তিনি বলেন, ভবনের বেইজ ঢালাইসহ প্রায় ৬০ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হওয়ার পর হঠাৎ নির্মাণকাজে বাধা দেওয়া হয়েছে। তার প্রশ্ন, যদি জায়গাটি সংরক্ষিত বনাঞ্চলের আওতায় পড়ে, তাহলে ২০২২ সালে কাজ শুরুর সময় আপত্তি জানানো হয়নি কেন।
অন্যদিকে, পার্বত্য চট্টগ্রাম দক্ষিণ বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা এস এম সাজ্জাদ হোসেন বলেন, সীতা পাহাড় এলাকা সংরক্ষিত বনভূমির অন্তর্ভুক্ত। সরকারি সংরক্ষিত বনে কোনো ধরনের স্থাপনা নির্মাণের সুযোগ নেই। তিনি দাবি করেন, নির্মাণকাজ শুরুর সময়ও আপত্তি জানানো হয়েছিল এবং বিষয়টি সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরগুলোকে লিখিতভাবে অবহিত করা হয়েছে। একই কারণে ওই এলাকায় এলজিইডির একটি সড়ক নির্মাণকাজও বন্ধ রাখা হয়েছে বলে জানান তিনি।
কাপ্তাই উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান দিলদার হোসেন বলেন, সীতা পাহাড়, সীতাঘাট ও সীতাঘাট মন্দির বহু বছর ধরে এলাকার ঐতিহ্যের অংশ। প্রতিবছর দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে ভক্তরা এখানে পূজা-অর্চনা করতে আসেন। তার মতে, নির্মাণকাজ শেষ পর্যায়ে এসে বন্ধ হওয়ায় এলাকায় সম্প্রীতির পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
প্রকল্পটির ঠিকাদার আক্তার হোসেন মিলন জানান, কাজ সম্পন্নের জন্য প্রকল্পের মেয়াদ এক বছর বাড়ানো হয়েছিল। ইতোমধ্যে প্রায় ৬০ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে এবং উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বিলও উত্তোলন করা হয়েছে। কাজ বন্ধ থাকায় তিনি যেমন আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন, তেমনি সরকারি অর্থের কার্যকর ব্যবহারও ব্যাহত হচ্ছে।
সীতাঘাট মন্দির পরিচালনা কমিটির সভাপতি সমলেন্দু বিকাশ দাশ বলেন, এটি সনাতন ধর্মাবলম্বীদের একটি ঐতিহাসিক তীর্থস্থান। উৎসব ছাড়াও প্রতিদিন অসংখ্য ভক্ত এখানে আসেন। তিনি অসমাপ্ত ভবনের নির্মাণকাজ দ্রুত শেষ করার দাবি জানান।
রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের সহকারী প্রকৌশলী উজ্জল দেওয়ান বলেন, প্রকল্প অনুমোদনের আগেই ওই এলাকায় একাধিক স্থাপনা ছিল। বাজেট স্বল্পতার কারণে প্রকল্পটি তিন বছর মেয়াদে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। তিনি বলেন, কাজ শুরুর সময় যদি সংরক্ষিত বনাঞ্চলের বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হতো, তাহলে সেখানে সরকারি অর্থ ব্যয় করা হতো না।
এদিকে, মন্দিরের নির্মাণকাজ বন্ধ থাকায় স্থানীয়দের মধ্যে দ্রুত সমাধানের দাবি জোরালো হয়েছে। তারা সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে আলোচনার মাধ্যমে বিষয়টির গ্রহণযোগ্য সমাধান করে উন্নয়ন ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখার আহ্বান জানিয়েছেন।
আপনার মতামত লিখুন :