মৌলভীবাজারে জুলাই বিপ্লব, রক্তে লেখা বিজয়ের দিন!
নিজস্ব প্রতিবেদক
- প্রকাশিত : ০৫ আগস্ট, ২০২৫ খ্রিস্টাব্দ
আলী মোহাম্মদ :
২০২৪ সালের জুলাই বাংলাদেশ ইতিহাসে একটি বিস্ফোরক অধ্যায় হয়ে রয়ে যাবে। আর সেই ইতিহাসের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে মৌলভীবাজার। বৈষম্যের বিরুদ্ধে মুখোমুখি হয় শাসক ও ছাত্র-জনতা। কোটা সংস্কারের দাবিতে প্রথমে শুরু হয় ছেলেখেলার মতো নিরীহ এক অবস্থান। ১০ জুলাই মৌলভীবাজার সরকারি কলেজের গেইটে কিছু সংখ্যক শিক্ষার্থীর ছোট্ট একটি ব্যানার- “বৈষম্যের বিরুদ্ধে আমরা এককাট্টা”—এই সরল দাবিই পরিণত হয় আগুনে। ১৩ জুলাই প্রেসক্লাব থেকে বের হয় প্রথম মিছিল, যেখানে উপস্থিতির চেয়ে ছিল বেশি সাহস ও প্রতিজ্ঞা।
১৫ জুলাই শুরু হয় রাষ্ট্রীয় ফ্যাসিবাদের নগ্ন রূপ। বিএনপি ও জামায়াত নেতাদের বিরুদ্ধে গায়েবি মামলা দিয়ে একে একে গ্রেপ্তার করতে থাকে পুলিশ। গা ঢাকা দিতে বাধ্য হয় শত শত মানুষ। অথচ রাজপথে ততক্ষণে ছাত্রসমাজ শক্তি সঞ্চয় করছে। ১৬ জুলাই পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট থেকে কয়েক শতাধিক শিক্ষার্থীর মিছিল চৌমুহনা অবধি আসতেই শুরু হয় পুলিশের বর্বর লাঠিচার্জ। একই দিনে সরকারি কলেজে ছাত্রলীগের হামলায় রক্তাক্ত হন শিক্ষার্থীরা। শহরে গুম, গ্রেপ্তার আর আতঙ্কের মধ্যেও আন্দোলন থেমে থাকেনি।
১৭ জুলাই দেখা যায় আরও নিষ্ঠুরতা—ছাত্রলীগ ও পুলিশের যৌথ হামলায় জখম হন একাধিক শিক্ষার্থী। শহরের মসজিদে গায়েবানা জানাজা হয় আহতদের স্মরণে, আর তাতেই আন্দোলন পায় ধর্মীয় আবেগের নতুন ছোঁয়া। ১৮ জুলাই শহরের রাস্তায় সড়ক অবরোধ করতে গেলে ছাত্রলীগ-যুবলীগের হামলায় আহত হয় আরও শিক্ষার্থী। আশ্রয় নেয় দোকানে, তবুও রেহাই মেলেনি। শহরের প্রতিটি মোড়ে, গলিতে গলিতে অবস্থান নেয় আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা দেশীয় অস্ত্র নিয়ে। স্পষ্ট হয়ে ওঠে- শুধু আন্দোলন নয়, এই যুদ্ধ ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে।
১৯ জুলাই রাতে কারফিউ। ২০ জুলাই মাঠে নামে সেনাবাহিনী, শুরু হয় চেকপোস্ট, টহল, তল্লাশি। শহর যেন পরিণত হয় ছায়া-সেনা শাসনের পরীক্ষাগারে। কিন্তু জনগণ নত হয়নি। ৩ আগস্ট জুড়ীতে ছাত্রদের মিছিলে আবারও হামলা চালায় শাসকদলের পেটোয়া বাহিনী। কিন্তু আসল আগুন জ্বলে ৪ আগস্ট। সকালে সরকারি কলেজ থেকে যাত্রা করে শত শত শিক্ষার্থীর মিছিল। পুলিশ ব্যারিকেড দিয়ে ঠেকাতে চাইলেও তারা পৌঁছে যায় চৌমুহনায়। সেখানে প্রতিরোধের মুখে পড়ে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের সশস্ত্র বাহিনী। শুরু হয় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ। দেশীয় অস্ত্র, লাঠি, রড, এমনকি আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করে ছাত্রদের ওপর হামলা চালানো হয়। আহত হন বহু আন্দোলনকারী, তাদের অনেকে প্রাইভেট হাসপাতালে চিকিৎসা নেন, নিরাপত্তার জন্য।
সাংবাদিকরাও রেহাই পাননি। ক্যামেরা ভাঙচুর, মোটরসাইকেল পুড়িয়ে দেওয়া, সরঞ্জাম ছিনিয়ে নেওয়া, এমনকি শারীরিকভাবে আঘাত- সবকিছুই যেন স্পষ্ট বার্তা দেয়, সত্য প্রকাশ করাও অপরাধ। সাংবাদিকতার মুখে ছিল কষাঘাত, ন্যায়ের কণ্ঠরোধ করতে উঠেপড়ে লেগেছিল সরকারপন্থী বাহিনী।
এদিকে সকাল থেকে ইন্টারনেট চালু হতেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে ছাত্রদের উপর বর্বর হামলার ভিডিও। মুহূর্তে জেগে ওঠে দেশ। মৌলভীবাজারের রাজপথে নেমে আসে হাজার হাজার মানুষ—বিএনপি, জামায়াত, হেফাজত, খেলাফত, ইসলামী আন্দোলন, এমনকি দলমতনির্বিশেষে নির্যাতিত প্রতিটি হৃদয়। দুপুরে পাল্টা প্রতিরোধে শহর দখলে নেয় ছাত্র-জনতা। পুলিশ পিছু হটে, সরকারদলীয় নেতাকর্মীরা এলাকা ছাড়ে। শহরের চৌমুহনায় দাঁড়িয়ে জনতা আদায় করে যোহরের নামাজ এবং শুকরানা নামাজ- প্রতীক হয়ে দাঁড়ায় নাগরিক বিজয়ের।
বিকেল পর্যন্ত চলে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া, গুলি, বোমা, টিয়ারশেল, সাউন্ড গ্রেনেড। পুলিশ দমাতে ব্যর্থ হয়। প্রেসক্লাব থেকে অতিরিক্ত পুলিশ সুপারের অফিস অবধি রাস্তায় দাঁড়িয়ে পড়ে প্রায় ৫০ হাজার মানুষ। মৌলভীবাজার তখন আর কোনো রাজনৈতিক দলের নিয়ন্ত্রণে নয়, এটি হয়ে ওঠে সাধারণ মানুষের হাতে থাকা মুক্তিকামী এক নগর।
৫ আগস্ট দুপুরে ছড়িয়ে পড়ে- প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করেছেন। মুহূর্তেই উৎসবের নগরীতে পরিণত হয় মৌলভীবাজার। পতাকা উড়ানো, স্লোগান, কান্না, উল্লাস—সবকিছুর মিশেলে ঘোষণা করে দেওয়া হয়—বাংলাদেশ আবারও স্বাধীন হলো।
জুলাই বিপ্লব শুধু একটি আন্দোলনের নাম নয়। এটি ছিল একটি জনতার প্রতিরোধ, একটি দীর্ঘশ্বাসের বিস্ফোরণ। মৌলভীবাজারের রাজপথে যে রক্ত ঝরেছে, তা বৃথা যায়নি। এই বিজয় শুধুই একটি শহরের নয়, এটি গোটা জাতির জন্য একটি আশার আলো, একটি বার্তা—ফ্যাসিবাদ কখনও চিরস্থায়ী নয়, সত্যের শক্তিই চূড়ান্ত বিজয়ের চাবিকাঠি।
আপনার মতামত লিখুন :