যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের দ্বিমুখী নির্ভরতায় পাকিস্তান, চাপে স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি
নিজস্ব প্রতিবেদক
- প্রকাশিত : ২৭ অক্টোবর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
আন্তর্জাতিক ডেস্ক :
পাকিস্তানের পররাষ্ট্রনীতিতে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সঙ্গে সম্পর্ক দীর্ঘদিন ধরেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক সহযোগিতা বজায় রেখেছে দেশটি, অন্যদিকে চীনের সঙ্গে সামরিক ও অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব আরও জোরদার করেছে। তবে দুই বৈশ্বিক শক্তির সঙ্গে সম্পর্কের ভারসাম্য রক্ষা এবং আঞ্চলিক বিভিন্ন ইস্যুতে অবস্থান নেওয়ার ক্ষেত্রে পাকিস্তানের নীতি নিয়ে নানা প্রশ্ন ও বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
স্ট্র্যাটনিউজ গ্লোবালে প্রকাশিত এক বিশ্লেষণে পাকিস্তানের এই পররাষ্ট্রনীতিকে পরস্পরবিরোধী হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করতে ইসলামাবাদ একাধিক শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখার চেষ্টা করছে। তবে এই কৌশল দেশটির কূটনৈতিক স্বাধীনতা কতটা নিশ্চিত করতে পারছে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।
পাকিস্তানের ভৌগোলিক অবস্থান এবং ভারতের সঙ্গে দীর্ঘদিনের বৈরিতা দেশটির পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম প্রধান নিয়ামক। সামরিক ও অর্থনৈতিক সক্ষমতায় ভারতের তুলনায় পিছিয়ে থাকার কারণে আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য রক্ষায় যুক্তরাষ্ট্র, চীনসহ বিভিন্ন প্রভাবশালী দেশের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারের কৌশল নিয়েছে ইসলামাবাদ।
অর্থনৈতিক সংকটও পাকিস্তানের এই নির্ভরশীলতা বাড়িয়েছে। বিভিন্ন সময়ে উপসাগরীয় দেশগুলোর আর্থিক সহায়তা, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ঋণ কর্মসূচি এবং চীনা বিনিয়োগের ওপর নির্ভর করতে হয়েছে দেশটিকে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক আইএমএফের সহায়তা পাওয়ার ক্ষেত্রে কূটনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হলেও চীন পাকিস্তানের অবকাঠামো উন্নয়ন, জ্বালানি ও সামরিক সহযোগিতার অন্যতম প্রধান অংশীদার।
তবে বিদেশি সহায়তা ও বিনিয়োগের মাধ্যমে সাময়িকভাবে অর্থনৈতিক চাপ মোকাবিলা করা গেলেও পাকিস্তানের অর্থনীতির কাঠামোগত দুর্বলতা পুরোপুরি কাটেনি। ঋণের বোঝা, বৈদেশিক মুদ্রার সংকট এবং আর্থিক স্থিতিশীলতা নিয়ে উদ্বেগ দেশটির নীতিনির্ধারকদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে। ফলে অর্থনৈতিক সহায়তা নিশ্চিত করতে গিয়ে আন্তর্জাতিক অংশীদারদের স্বার্থ ও প্রত্যাশার সঙ্গে নিজেদের নীতিগত অবস্থানের সমন্বয় করতে হচ্ছে পাকিস্তানকে।
বিশ্লেষণে দেশটির পররাষ্ট্রনীতি নির্ধারণে সামরিক ও আমলাতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের প্রভাবের বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে। পাকিস্তানের নিরাপত্তা ও বৈদেশিক সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলোতে সামরিক প্রতিষ্ঠানের প্রভাব দীর্ঘদিনের। এ কারণে বেসামরিক রাজনৈতিক নেতৃত্বের সঙ্গে ক্ষমতার টানাপোড়েন এবং অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তাসংক্রান্ত জটিলতা দেশটির নীতিনির্ধারণকে আরও কঠিন করে তুলেছে।
আফগানিস্তান, কাশ্মীর ও ইরান-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন আঞ্চলিক ইস্যুতেও পাকিস্তানের অবস্থান নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। এসব বিষয়ে নিরাপত্তা, প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক এবং বৃহৎ শক্তিগুলোর স্বার্থের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা ইসলামাবাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ।
সব মিলিয়ে, পাকিস্তানকে কেবল যুক্তরাষ্ট্র বা চীনের অনুগত রাষ্ট্র হিসেবে বিবেচনা করা যথাযথ নয়। বরং দেশটি নিজস্ব নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক প্রয়োজন এবং আঞ্চলিক প্রভাব বিবেচনায় নিয়ে বহুমুখী সম্পর্ক বজায় রাখার চেষ্টা করছে। তবে অর্থনৈতিক দুর্বলতা, নিরাপত্তা উদ্বেগ এবং বিদেশি সহায়তার ওপর নির্ভরতা দেশটির স্বাধীনভাবে পররাষ্ট্রনীতির সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরিসর সীমিত করে দিচ্ছে।
বিশ্লেষকদের দৃষ্টিতে, দীর্ঘমেয়াদে এই নির্ভরতা কাটিয়ে উঠতে পাকিস্তানের অর্থনৈতিক ভিত্তি শক্তিশালী করা, অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা এবং বৈদেশিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে আরও কার্যকর ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করা জরুরি।
আপনার মতামত লিখুন :