সংকটের ভারে ক্লান্ত সময়ে ‘রাগ করলা?’ কেন হঠাৎ দেশের সবচেয়ে ভাইরাল প্রশ্ন


FavIcon
নিজস্ব প্রতিবেদক
  • প্রকাশিত : ২১ মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

ছবির ক্যাপশন:

অনলাইন ডেস্ক :

জ্বালানি সংকট, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, হামে শিশুমৃত্যু, আন্তর্জাতিক যুদ্ধের প্রভাব আর বাণিজ্যিক অনিশ্চয়তা—নানা সংকটে দেশ যখন এক কঠিন সময় পার করছে, ঠিক তখনই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমজুড়ে মানুষের মুখে মুখে ঘুরছে এক অদ্ভুত কিন্তু হালকা প্রশ্ন—‘রাগ করলা?’

জাতীয় ও সামাজিক বড় ইস্যুগুলোর ভিড়ে হঠাৎ করে এই দুই শব্দ যেন হয়ে উঠেছে অনলাইন দুনিয়ার সবচেয়ে জনপ্রিয় অভিব্যক্তি। মিম পেজ, কনটেন্ট ক্রিয়েটর, ইনফ্লুয়েন্সার থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ, এমনকি করপোরেট বিজ্ঞাপনেও জায়গা করে নিয়েছে ‘রাগ করলা?’। সামাজিক সচেতনতার বার্তায় এই শব্দ ব্যবহার করেছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন-এর মতো প্রতিষ্ঠানও।

এই ভাইরাল ট্রেন্ডের উৎস গাজীপুরের সফিপুর এলাকার কনটেন্ট ক্রিয়েটর ইমান আলী। ফেসবুকে তার নামের একটি পেজে পোস্ট করা ভিডিওগুলো থেকেই ‘রাগ করলা?’ শব্দযুগলের জন্ম। ভিডিওতে তাকে দেখা যায় কবিরাজ বা জ্যোতিষীর বেশে বাসস্ট্যান্ড, বাজার বা রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে মানুষের হাত দেখে ভাগ্য গণনা করতে। কথা বলতে বলতে হঠাৎ জিজ্ঞেস করেন—‘কথাটা ঠিক না বেঠিক? কী, রাগ করলা?’

এই স্বাভাবিক প্রশ্ন আর বলার ভঙ্গিই যেন দর্শকের মনে দাগ কেটেছে। তার পেজের অনুসারী এখন প্রায় এক লাখ ৪০ হাজার। গত ১২ মে পোস্ট করা একটি ভিডিওই দেখা হয়েছে এক কোটির বেশি বার। ভিডিওগুলোতে কখনো ৫০০ টাকা, কখনো কয়েক হাজার টাকা হাতিয়ে নেওয়ার দৃশ্য দেখানো হলেও ইমান আলীর দাবি, এগুলো প্রতারণা নয়, বরং প্রতারণা থেকে মানুষকে সচেতন করার চেষ্টা।

নিজের অভিজ্ঞতার কথাও তুলে ধরেছেন তিনি। ইমান আলী জানান, ৬–৭ বছর আগে ঢাকার যাত্রাবাড়ী এলাকায় রিকশা চালানোর সময় এক ব্যক্তি তাকে প্রতারণা করে ৭ হাজার টাকা নিয়ে যায়। সেই ঘটনার পর থেকেই মানুষকে সচেতন করার ভাবনা আসে তার মাথায়। মোবাইল ফোনে ভিডিও বানিয়ে সেই বার্তাই তিনি পৌঁছে দিতে চান।

ইমান আলীর জীবনের গল্পও সংগ্রামের। লালমনিরহাটের হাতিবান্ধা থেকে ঢাকায় আসা, রিকশা চালানো, দিনমজুরি, মাটি কাটার কাজ—সব পেরিয়ে এখন কনটেন্ট তৈরির মাধ্যমে পরিচিত মুখ হয়ে ওঠা। ‘রাগ করলা?’ জনপ্রিয় হওয়ায় তিনি নিজেও বিস্মিত ও আনন্দিত। তার ভাষায়, মানুষ তাকে খুঁজছে, সাংবাদিকরা গল্প জানতে চাইছে—এটাই তার বড় প্রাপ্তি।

এই ট্রেন্ড ছড়িয়ে পড়ার পেছনে কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের অনুকরণও বড় ভূমিকা রেখেছে। সামাজিক ও রাজনৈতিক ইস্যু থেকে শুরু করে ব্যক্তিগত সম্পর্ক, পারিবারিক টানাপোড়েন—সব কিছুর সঙ্গেই জুড়ে যাচ্ছে ‘রাগ করলা?’।

এ বিষয়ে লেখক ও কনটেন্ট ক্রিয়েটর সোহাইল রহমান বলেন, বাংলাদেশে কী ভাইরাল হবে, তা আগে থেকে বলা কঠিন। নতুন শব্দ, আবেগী উপস্থাপন আর দ্রুত অনুকরণই এই ট্রেন্ডকে ছড়িয়ে দিয়েছে। পাশাপাশি রাজনৈতিকভাবে সচেতন সময়ের কারণে মিমে রাজনীতির ছোঁয়া থাকলে সেটিও দ্রুত জনপ্রিয় হয়।

তবে এই ট্রেন্ড দীর্ঘস্থায়ী হবে না বলেই মনে করেন তিনি। অতীতের অনেক ভাইরাল ট্রেন্ডের মতোই নতুন কোনো ইস্যু এলে ‘রাগ করলা?’ও হারিয়ে যেতে পারে।

সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, কঠিন বাস্তবতায় ক্লান্ত মানুষের জন্য এ ধরনের হালকা কনটেন্ট এক ধরনের মানসিক বিশ্রাম। এ প্রসঙ্গে ড. সামিনা লুৎফা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক, বলেন—সোশ্যাল মিডিয়ার অ্যালগরিদমই হালকা বিষয়গুলোকে বেশি সামনে আনে। তবে ভাইরাল যা-ই হোক, রাষ্ট্র পরিচালনায় প্রকৃত অগ্রাধিকার যেন আড়ালে না পড়ে, সেটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

সবকিছুর মাঝেও ইমান আলী আশাবাদী। মানুষের সচেতনতা আর ভালোবাসাই তার মূল প্রেরণা। তিনি বলেন, মানুষ যেভাবে তাকে গ্রহণ করেছে, সেই ভালোবাসা নিয়েই তিনি কাজ চালিয়ে যেতে চান।

সব সংকটের ভিড়ে তাই আপাতত অনলাইন দুনিয়ায় প্রশ্ন একটাই—
‘রাগ করলা?’


ad728

আলোচিত শীর্ষ ১০ সংবাদ