রোহিঙ্গাদের অনির্দিষ্টকাল আশ্রয়ে রাখতে চায় না বাংলাদেশ : প্রধানমন্ত্রী
নিজস্ব প্রতিবেদক
- প্রকাশিত : ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
নিউজ বাংলা ডেস্ক :
রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধানে তাদের দ্রুত, নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের জন্য একটি সুস্পষ্ট ও বিশ্বাসযোগ্য রোডম্যাপ প্রণয়নের আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, বাংলাদেশ চায় না রোহিঙ্গারা চিরকাল বাস্তুচ্যুত অবস্থায় থাকুক। সংকটের উৎপত্তি মিয়ানমারে, তাই এর সমাধানও মিয়ানমারেই নিহিত।
বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দফতরে রোহিঙ্গা সংকটবিষয়ক এক উচ্চপর্যায়ের সাইড ইভেন্টে বক্তব্য দেওয়ার সময় তিনি এসব কথা বলেন। বাংলাদেশ ও গাম্বিয়ার যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠিত এ অনুষ্ঠানে রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধানে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কার্যকর ভূমিকার ওপর গুরুত্ব দেন প্রধানমন্ত্রী।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে মিয়ানমারে রোহিঙ্গারা বৈষম্য, নিপীড়ন ও বঞ্চনার শিকার হয়ে আসছে। ১৯৭৮ সাল থেকে বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের বড় ধরনের আগমন প্রত্যক্ষ করেছে। ২০১৭ সালে মিয়ানমারে সহিংসতার পর পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটে। বর্তমানে ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়ে আছে এবং মিয়ানমারে সহিংসতার কারণে এখনো নতুন করে মানুষ পালিয়ে আসছে।
তিনি বলেন, প্রতিবছর শিবিরগুলোতে হাজার হাজার শিশুর জন্ম হচ্ছে। ফলে দীর্ঘস্থায়ী বাস্তুচ্যুতির সঙ্গে নতুন আরেকটি প্রজন্ম যুক্ত হচ্ছে। মায়েরা নিরাপদ ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখছেন, তরুণরা অনিশ্চয়তার মধ্যে বেড়ে উঠছে এবং প্রবীণরা নিজেদের ফেলে আসা ঘরবাড়ি ও গ্রামের স্মৃতি বুকে নিয়ে ফিরে যাওয়ার অপেক্ষায় রয়েছেন।
তারেক রহমান বলেন, মানবিকতার তাগিদে বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের জন্য সীমান্ত খুলে দিয়েছে। শিবিরগুলোতে খাদ্য ও স্বাস্থ্যসেবা দেওয়ার পাশাপাশি প্রায় ছয় হাজার শিক্ষাকেন্দ্রে শিশুদের মিয়ানমারের পাঠ্যক্রমভিত্তিক শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে। তরুণদের দক্ষতা উন্নয়ন ও সক্ষমতা বৃদ্ধির প্রশিক্ষণও দেওয়া হচ্ছে, যাতে ভবিষ্যতে তারা রাখাইন রাজ্যে পুনঃএকীভূত হতে পারে।
তবে দীর্ঘমেয়াদি বসবাসের জন্য রোহিঙ্গা শিবিরগুলো কোনো আদর্শ স্থান নয় উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দীর্ঘস্থায়ী বাস্তুচ্যুতির কারণে কক্সবাজারের স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপরও সামাজিক, অর্থনৈতিক, পরিবেশগত ও নিরাপত্তাজনিত চাপ বাড়ছে। দীর্ঘ অনিশ্চয়তা মানবপাচার, অবৈধ অভিবাসী পাচার, মাদকপাচারসহ বিভিন্ন আন্তঃসীমান্ত অপরাধের ঝুঁকিও বাড়িয়ে তুলছে।
রোহিঙ্গা সংকটে আন্তর্জাতিক মানবিক সহায়তা কমে যাওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি জানান, ২০২৫ সালের যৌথ সাড়াদান পরিকল্পনায় ৯৩৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি সহায়তার আবেদন করা হলেও ২০২৬ সালের জন্য তা কমিয়ে প্রায় ৭১০ মিলিয়ন ডলারে নামিয়ে আনা হয়েছে। তার ভাষ্য, এই অর্থ কেবল ন্যূনতম জীবনরক্ষাকারী প্রয়োজন মেটানোর জন্যই প্রয়োজন।
রাখাইন রাজ্যের পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন তারেক রহমান। তিনি বলেন, রোহিঙ্গারা এখনো জোরপূর্বক নিয়োগ, নির্বিচারে আটক, চলাচলে বিধিনিষেধ, জোরপূর্বক শ্রমসহ বিভিন্ন ধরনের নির্যাতন ও নিরাপত্তাহীনতার শিকার হচ্ছে। মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী এবং আরাকান আর্মি উভয়ের বিরুদ্ধেই গুরুতর লঙ্ঘনের অভিযোগের তথ্য পাওয়া গেছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে পাঁচটি জরুরি পদক্ষেপের প্রস্তাব দেন প্রধানমন্ত্রী। এর মধ্যে রয়েছে নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের জন্য সুস্পষ্ট রোডম্যাপ প্রণয়ন, রোহিঙ্গাসহ মিয়ানমারের বেসামরিক জনগণের ওপর সহিংসতা বন্ধ ও মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা, পর্যাপ্ত ও পূর্বানুমেয় মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করা, ন্যায়বিচার ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা এবং মাদকপাচার, মানবপাচার, ডিজিটাল প্রতারণা ও অবৈধ অস্ত্রসহ আন্তঃসীমান্ত অপরাধ মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ানো।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, গুরুতর অপরাধের জন্য দায়ীদের অবশ্যই জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। এ ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে জবাবদিহি নিশ্চিতের প্রচেষ্টায় গাম্বিয়ার ভূমিকার প্রশংসা করেন তিনি। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতসহ অন্যান্য আন্তর্জাতিক বিচার ও তদন্ত ব্যবস্থার ভূমিকার কথাও তুলে ধরেন।
তারেক রহমান বলেন, বাংলাদেশ চায় না রোহিঙ্গারা চিরকাল বাস্তুচ্যুত অবস্থায় থাকুক। তারা যেন নিরাপদে, স্বেচ্ছায়, মর্যাদার সঙ্গে এবং অধিকার সুরক্ষিত রেখে মিয়ানমারে নিজ ঘরে ফিরে যেতে পারে, সেটিই বাংলাদেশের প্রত্যাশা।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ মানবিকতার সঙ্গে তার দায়িত্ব পালন করেছে। এখন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কেও দৃঢ় প্রত্যয়ের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করতে হবে। প্রয়োজনীয় পরিস্থিতি সৃষ্টি করা হলে বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনে সহায়তা করতে প্রস্তুত রয়েছে।
রোহিঙ্গাদের ভবিষ্যৎ যেন নিপীড়ন, বিতাড়ন ও বাস্তুচ্যুতির গল্পে সীমাবদ্ধ না থাকে, বরং তা যেন ন্যায়বিচার, মর্যাদা ও আশার গল্পে পরিণত হয়, সেই প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন প্রধানমন্ত্রী।
আপনার মতামত লিখুন :