কমলনগরের তিন ঘাটে ‘গলাকাটা টোল’ আদায়ের অভিযোগ, জিম্মি যাত্রী-ব্যবসায়ীরা
নিজস্ব প্রতিবেদক
- প্রকাশিত : ১৩ আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
মো: হাসান হাওলাদার, কমলনগর (লক্ষ্মীপুর) প্রতিনিধি :
লক্ষ্মীপুরের কমলনগরে মেঘনা নদীর তীরবর্তী তিনটি লঞ্চঘাটে সরকারি নিয়ম উপেক্ষা করে অতিরিক্ত টোল আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, মতিরহাট, নবীগঞ্জ ও মাতাব্বরহাট ঘাটে একটি সিন্ডিকেটের মাধ্যমে নির্ধারিত হারের কয়েক গুণ বেশি টাকা আদায় করা হচ্ছে। এতে সাধারণ যাত্রী, শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে নদীকেন্দ্রিক ব্যবসায়ী ও মালবাহী পণ্য পরিবহনকারীরা ভোগান্তিতে পড়েছেন।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, চরকালকিনির বাসিন্দা মুক্তার হোসেন জেলা পরিষদ থেকে ভোলা-লক্ষ্মীপুর নৌপথের একটি খেয়াঘাট এক বছরের জন্য ইজারা নেন। ইজারার শর্ত অনুযায়ী, নির্ধারিত হারে শুধু খেয়া নৌকা থেকে টোল আদায়ের কথা। তবে অভিযোগ রয়েছে, সেই শর্ত ভেঙে তিনি কাদির, আক্কর, মানিক ও শাহজাহান নামে কয়েকজনের কাছে সাব-ইজারা দিয়েছেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, সাব-ইজারার মাধ্যমে নির্ধারিত টাকার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি টোল আদায় করা হচ্ছে। প্রতিবাদ করলে নানা ধরনের হুমকি দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, বিআইডব্লিউটিএর আওতাধীন মতিরহাট ও মাতাব্বরহাট লঞ্চঘাটেও মুক্তার হোসেনের লোকজন প্রভাব বিস্তার করে টোল আদায় করছে। স্থানীয়দের দাবি, বিআইডব্লিউটিএর কিছু অসাধু কর্মকর্তাকে ম্যানেজ করে ঘাটগুলোর নিয়ন্ত্রণ নেওয়া হয়েছে। ফলে একই এলাকায় সরকারি বিভিন্ন কর্তৃপক্ষের নাম ব্যবহার করে দ্বৈতভাবে টাকা আদায়ের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
আদালতে রিট, এরপর খাস কালেকশন
মুক্তারের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগের পর বিআইডব্লিউটিএ ইজারা প্রক্রিয়া বন্ধ করলে তিনি হাইকোর্টে রিট করেন। আদালত ছয় মাসের জন্য ইজারা প্রক্রিয়ার ওপর স্থগিতাদেশ দেন। এরপর সরকারি রাজস্ব নিশ্চিত করতে বিআইডব্লিউটিএ খাস কালেকশনের মাধ্যমে টোল আদায়ের উদ্যোগ নেয়।
তবে অভিযোগ রয়েছে, ওই সময়ও মুক্তারের লোকজন কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি দেখিয়ে ঘাট থেকে সরিয়ে দেয়।
৩-৪ গুণ বেশি টোল আদায়ের অভিযোগ
স্থানীয়দের অভিযোগ, সরকারি নির্ধারিত হারের তুলনায় তিন থেকে চার গুণ বেশি টাকা আদায় করা হচ্ছে। এতে প্রতিদিনই সাধারণ মানুষের পকেট থেকে অতিরিক্ত অর্থ চলে যাচ্ছে। নদীপথে চলাচলকারী যাত্রী, স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ী এবং পণ্য পরিবহনকারীরা এ পরিস্থিতিতে জিম্মি হয়ে পড়েছেন বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা।
বিআইডব্লিউটিএর সহকারী বন্দর কর্মকর্তা শাহ আলম বলেন, মুক্তার হোসেনের কাগজপত্রে টোল আদায়ের বৈধ সুযোগ নেই। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে তার বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
কমলনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রাহাত উজ-জামান বলেন, সরকারি বিধি লঙ্ঘন করে বেআইনিভাবে টোল আদায়ের সুযোগ নেই। অভিযোগের ভিত্তিতে দ্রুত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অভিযোগ অস্বীকার মুক্তারের
তবে সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন মুক্তার হোসেন। তিনি বলেন, জেলা পরিষদ থেকে তিনি ঘাটটি ইজারা নিয়েছেন। বিআইডব্লিউটিএ সেখানে অনিয়ম করে টোল আদায়ের চেষ্টা করেছিল বলেও দাবি করেন তিনি। এ কারণে আদালতের আশ্রয় নিয়েছেন বলে জানান মুক্তার।
তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, আদালতের স্থগিতাদেশকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে ঘাটগুলোতে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট অতিরিক্ত টোল আদায় করছে। তাদের দাবি, মেঘনার এই তিন ঘাটে দীর্ঘদিন ধরে চলা অনিয়ম বন্ধ করে সরকারি বিধি অনুযায়ী টোল আদায় নিশ্চিত করা জরুরি।
এ অবস্থায় অভিযোগের তদন্ত করে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন এবং সাধারণ মানুষের কাছ থেকে বেআইনি টোল আদায় বন্ধে প্রশাসন দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেবে, এমনটাই প্রত্যাশা স্থানীয়দের।
আপনার মতামত লিখুন :