মাশহাদে চিরনিদ্রায় আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি, সপ্তাহব্যাপী শোকযাত্রার পর শেষ বিদায়
নিজস্ব প্রতিবেদক
- প্রকাশিত : ০৯ জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
আন্তর্জাতিক ডেস্ক :
আধুনিক ইরানের ইতিহাসে অন্যতম প্রভাবশালী রাজনৈতিক ও ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ আলী খামেনির সপ্তাহব্যাপী রাষ্ট্রীয় শোকযাত্রা ও শেষ বিদায়ের আনুষ্ঠানিকতা শেষ হয়েছে। বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) তার জন্মশহর মাশহাদের ইমাম রেজা (আ.)-এর পবিত্র মাজার প্রাঙ্গণে তাকে দাফন করা হয়। শেষ শ্রদ্ধা জানাতে দেশ-বিদেশ থেকে লাখো শোকাহত মানুষ মাশহাদে সমবেত হন।
দাফনের আগে ইরানের বিভিন্ন শহর এবং ইরাকের নাজাফ ও কারবালায় একাধিক দফায় জানাজা ও শোকযাত্রা অনুষ্ঠিত হয়। বিপুল জনসমাগমের কারণে মাশহাদে নির্ধারিত সময় পরিবর্তন করে স্থানীয় সময় দুপুর ২টায় জানাজার শোভাযাত্রা শুরু হয়। সকাল থেকেই হাজারো মানুষ ইরানের জাতীয় পতাকা, খামেনির ছবি ও বিভিন্ন স্লোগানসংবলিত প্ল্যাকার্ড হাতে শেষ শ্রদ্ধা জানান।
অনুষ্ঠানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রাজনৈতিক প্রতিনিধি, ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব ও শিয়া নেতারা অংশ নেন। তাদের মধ্যে নাইজেরিয়ার শিয়া নেতা শেখ ইব্রাহিম জাকজাকিও উপস্থিত ছিলেন।
এর আগে ইরাকের নাজাফ ও কারবালায়ও নজিরবিহীন শোকযাত্রার আয়োজন করা হয়। ইরাকি কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, শুধু নাজাফে হযরত আলী (আ.)-এর পবিত্র মাজার ঘিরে প্রায় ৩৮ লাখ মানুষ শেষ শ্রদ্ধা জানান। পরে মরদেহ কারবালায় নেওয়া হয়।
৩ জুলাই থেকে শুরু হওয়া শেষ বিদায়ের আনুষ্ঠানিকতায় বিশ্বের ৪৫টির বেশি দেশের রাজনৈতিক প্রতিনিধি এবং ৯০টিরও বেশি দেশের আলেম ও ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব অংশ নেন। ৪ ও ৫ জুলাই তেহরানের ইমাম খোমেনি মোসাল্লায় শোকানুষ্ঠান, ৬ জুলাই রাজধানীতে গণজানাজা এবং ৭ ও ৮ জুলাই যথাক্রমে কোম, নাজাফ ও কারবালায় শেষ শ্রদ্ধা নিবেদন অনুষ্ঠিত হয়।
এদিকে, নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে নির্বাচিত মোজতবা খামেনি এখনো জনসমক্ষে আসেননি। ইরানি সূত্রের দাবি, গত ২৮ ফেব্রুয়ারির হামলায় তিনি গুরুতর আহত হন। নিরাপত্তা ও চিকিৎসাজনিত কারণে তিনি প্রকাশ্যে না এলেও লিখিত বার্তা দিয়েছেন বলে জানা গেছে।
দাফন অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া অনেকেই যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করেন এবং আয়াতুল্লাহ খামেনির হত্যার জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে দায়ী করে বিভিন্ন স্লোগান দেন।
চার দশকের রাজনৈতিক অধ্যায়ের সমাপ্তি
১৯৩৯ সালের ১৯ এপ্রিল মাশহাদে জন্মগ্রহণ করেন আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি। ধর্মীয় শিক্ষায় বেড়ে ওঠা খামেনি তরুণ বয়সে শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভির শাসনবিরোধী আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশ নেন এবং একাধিকবার কারাবরণ করেন।
১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের পর তিনি বিপ্লবী পরিষদের সদস্য, উপ-প্রতিরক্ষামন্ত্রী, সংসদ সদস্য এবং পরে প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮৯ সালে আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির মৃত্যুর পর ইরানের সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচিত হন তিনি।
টানা ৩৭ বছর ইরানের রাজনৈতিক, সামরিক ও ধর্মীয় নেতৃত্বের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা খামেনির আমলে ইসলামী বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) রাষ্ট্রের অন্যতম শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়। একই সময়ে তিনি মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তার, পারমাণবিক কর্মসূচি এবং তথাকথিত ‘প্রতিরোধ অক্ষ’ গড়ে তোলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
ইরানি সূত্রের দাবি, ২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যৌথ বিমান হামলায় পরিবারের কয়েকজন সদস্যসহ আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হন। তার মৃত্যু ইরানের রাজনৈতিক ও ধর্মীয় অঙ্গনে এক যুগের অবসান হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
আপনার মতামত লিখুন :