হরমুজ প্রণালিতে কেন বাংলাদেশি জাহাজ আটকে দিচ্ছে ইরান?
নিজস্ব প্রতিবেদক
- প্রকাশিত : ২২ এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
আন্তর্জাতিক ডেস্ক :
মধ্যপ্রাচ্যের উত্তপ্ত ভূরাজনীতির প্রভাব এবার সরাসরি এসে পড়েছে বাংলাদেশের সামুদ্রিক বাণিজ্যে। বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত নৌপথ হরমুজ প্রণালিতে ইরানের কঠোর নিয়ন্ত্রণের কারণে আটকে আছে বাংলাদেশি জাহাজ ‘বাংলার জয়যাত্রা’। এতে আমদানিনির্ভর বাংলাদেশের বাণিজ্য ও সরবরাহ ব্যবস্থায় উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড কোরের অনুমতি না পাওয়ায় জাহাজটি এখনো হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করতে পারেনি। কূটনৈতিক টানাপোড়েন, নিরাপত্তা ঝুঁকি ও আঞ্চলিক সংঘাতের প্রেক্ষাপটে জাহাজটির যাত্রা অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে বলে জানিয়েছে বিবিসি।
প্রায় ৩৭ হাজার টন সারবোঝাই ‘বাংলার জয়যাত্রা’ দুই দফা চেষ্টা করেও প্রণালিটি পার হতে ব্যর্থ হয়। বর্তমানে এটি সংযুক্ত আরব আমিরাতের একটি বন্দরের কাছাকাছি অপেক্ষমাণ অবস্থায় রয়েছে। বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশন–এর মালিকানাধীন জাহাজটি সিঙ্গাপুরভিত্তিক একটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পরিচালিত হলেও এর সব নাবিক বাংলাদেশি। জাহাজটির গন্তব্য ছিল দক্ষিণ আফ্রিকার কেপটাউন ও ডারবান বন্দর।
বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক কমোডর মাহমুদুল মালেক জানিয়েছেন, হরমুজ প্রণালি পার করার জন্য ইরানের অনুমোদন পেতে কূটনৈতিক চ্যানেলে জোর তৎপরতা চালানো হচ্ছে।
এই জটিলতা নিরসনে ঢাকা কূটনৈতিক উদ্যোগ জোরদার করেছে। তুরস্কে এক বৈঠকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান ইরানের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাঈদ খাতিবজাদহ–এর কাছে জাহাজটির নিরাপদ যাত্রা নিশ্চিত করতে সরাসরি সহায়তা চান। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, বিষয়টি এখন উচ্চ পর্যায়ের আলোচনায় রয়েছে।
সংকটটি শুধু একটি জাহাজে সীমাবদ্ধ নয়। ক্যামেন আইল্যান্ডের পতাকাবাহী আরেকটি জাহাজ, যা সৌদি আরবের জুয়াইমাহ টার্মিনাল থেকে অপরিশোধিত তেল নিয়ে চট্টগ্রামে আসার কথা ছিল, সেটিও ইরানের অনুমতি না পাওয়ায় যাত্রা শুরু করতে পারেনি। যদিও এর আগে ইরানের রাষ্ট্রদূত এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি বাংলাদেশসহ কয়েকটি দেশের জ্বালানিবাহী জাহাজ চলাচলের আশ্বাস দিয়েছিলেন।
ঢাকার কূটনৈতিক মহলে আলোচিত হচ্ছে, সাম্প্রতিক সময়ে ইরানে হামলা ও আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যুর পর বাংলাদেশের প্রতিক্রিয়া তেহরানকে সন্তুষ্ট করতে পারেনি। প্রথম বিবৃতিতে ইরানের পাল্টা হামলার সমালোচনা হলেও যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলের নাম উল্লেখ না করায় বাংলাদেশের অবস্থান একপেশে বলে মনে করেছে ইরান।
ঢাকায় নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূত জালিল রাহিমী জাহানাবাদী প্রকাশ্যে বাংলাদেশের অবস্থান নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশ চাইলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইরানের ওপর হামলার নিন্দা জানাতে পারত।
সাবেক কূটনীতিক হুমায়ুন কবির মনে করেন, পররাষ্ট্রনীতির নৈতিক অবস্থান স্পষ্ট না হওয়ায় বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে, যার প্রভাব পড়ছে বাস্তব ক্ষেত্রেও। তার মতে, কোনো দেশের ওপর আক্রমণের বিরোধিতা করার নীতিতে বাংলাদেশ সবসময় অটল থাকলেও সাম্প্রতিক ঘটনায় সেই অবস্থান পরিষ্কারভাবে প্রতিফলিত হয়নি।
বিশ্লেষকরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর ইরানের পাল্টা পদক্ষেপে উপসাগরীয় অঞ্চল অস্থিতিশীল হয়ে ওঠে। এর জেরে নিরাপত্তাজনিত কারণে হরমুজ প্রণালিতে কড়াকড়ি আরোপ করা হয় এবং প্রতিটি জাহাজ আলাদাভাবে যাচাই করা হচ্ছে।
বর্তমানে কূটনৈতিক আলোচনার ফলের দিকেই তাকিয়ে আছে ‘বাংলার জয়যাত্রা’। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, পারস্পরিক আস্থা ফিরলে এবং সম্পর্কের টানাপোড়েন কাটলে দ্রুতই জাহাজটির যাত্রা স্বাভাবিক হতে পারে। তবে এই ঘটনা স্পষ্ট করে দিয়েছে, ভূরাজনৈতিক সংকটের প্রভাব যুদ্ধক্ষেত্রের বাইরে গিয়েও বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
আপনার মতামত লিখুন :