শিল্পায়নহীন বরগুনায় দারিদ্র্য ও অভিবাসন বাড়ছে, হারাচ্ছে লোকসংস্কৃতি
নিজস্ব প্রতিবেদক
- প্রকাশিত : ২৮ জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
জাকিয়া সুলতানা, বরগুনা জেলা প্রতিনিধি :
বাংলাদেশের দক্ষিণ উপকূলের সম্ভাবনাময় জেলা বরগুনা। সমুদ্র, নদ-নদী, মৎস্যসম্পদ, কৃষি ও পর্যটনের বিপুল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও শিল্পায়নের অভাব, সীমিত কর্মসংস্থান, দুর্বল অবকাঠামো এবং জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবে জেলার উন্নয়ন কাঙ্ক্ষিত গতিতে এগোচ্ছে না। এর ফলে দারিদ্র্য, বৈষম্য ও অভিবাসন বাড়ছে, পাশাপাশি অবহেলার শিকার হচ্ছে সাহিত্য, সংস্কৃতি ও লোকঐতিহ্য।
জেলায় উল্লেখযোগ্য কোনো শিল্পপ্রতিষ্ঠান না থাকায় অধিকাংশ মানুষ কৃষি, মাছ ধরা, ক্ষুদ্র ব্যবসা ও দিনমজুরির ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু নদীভাঙন, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও লবণাক্ততার কারণে এসব পেশাও দিন দিন অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে। বছরের দীর্ঘ সময় অনেক মানুষ কর্মহীন থাকেন। কর্মসংস্থানের অভাবে প্রতিবছর অসংখ্য তরুণ পাড়ি জমাচ্ছেন ঢাকা, চট্টগ্রাম, বরিশাল, খুলনাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চল ও বিদেশে। অনেক ক্ষেত্রে ঋণ নিয়ে বিদেশে গিয়ে প্রতারণার শিকার হয়ে পরিবার ও সমাজে সংকট আরও গভীর হচ্ছে।
অর্থনৈতিক বৈষম্যও বাড়ছে দ্রুত। চরাঞ্চল ও উপকূলীয় এলাকার বহু পরিবার এখনো শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও নিরাপদ বাসস্থানের মতো মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত। একের পর এক প্রাকৃতিক দুর্যোগ এসব মানুষের জীবন ও জীবিকাকে আরও অনিশ্চিত করে তুলছে।
এদিকে বরগুনা জেলার ঐতিহ্যবাহী লোকসংস্কৃতিও হারিয়ে যাওয়ার পথে। একসময় গ্রামবাংলায় পালাগান, জারিগান, সারিগান, কবিগান ও লাঠিখেলার যে প্রাণবন্ত চর্চা ছিল, তা এখন প্রায় বিলুপ্ত। পৃষ্ঠপোষকতার অভাব ও আধুনিক প্রযুক্তির প্রভাবে নতুন প্রজন্ম এসব ঐতিহ্য থেকে ক্রমেই দূরে সরে যাচ্ছে।
সাহিত্যচর্চার ক্ষেত্রেও রয়েছে সীমাবদ্ধতা। প্রতিভাবান লেখক ও কবিরা ব্যক্তিগত উদ্যোগে কাজ করলেও নিয়মিত সাহিত্যসভা, প্রকাশনা, গবেষণা ও প্রশিক্ষণের সুযোগ খুবই অপ্রতুল। একইভাবে সাংস্কৃতিক অবকাঠামোর অভাবে সংগীত, নাটক, নৃত্য ও আবৃত্তিচর্চাও কাঙ্ক্ষিতভাবে বিকশিত হচ্ছে না।
জেলা পর্যটন শিল্প উন্নয়ন কমিটির সভাপতি অ্যাডভোকেট সোহেল হাফিজ বলেন, “বরগুনার সবচেয়ে বড় শক্তি এর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও পর্যটনের সম্ভাবনা। পরিকল্পিত বিনিয়োগ, উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং পর্যটনবান্ধব অবকাঠামো গড়ে তোলা গেলে হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং জেলার অর্থনীতি নতুন গতি পাবে।”
বরগুনা প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক আবু জাফর মো. সালেহ বলেন, “শিল্পায়নের অভাব, কর্মসংস্থানের সংকট, দুর্বল যোগাযোগ ব্যবস্থা, নদীভাঙন ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বরগুনার উন্নয়নকে পিছিয়ে দিচ্ছে। একই সঙ্গে শিক্ষা, সংস্কৃতি ও মানবসম্পদ উন্নয়নে প্রয়োজনীয় গুরুত্ব দেওয়া হয়নি।”
বরগুনা জেলা নাগরিক অধিকার সংরক্ষণ কমিটির সাধারণ সম্পাদক সাংবাদিক মনির হোসেন কামাল বলেন, “অবকাঠামো উন্নয়নের পাশাপাশি মানুষের জীবনমান, শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও সংস্কৃতির বিকাশ নিশ্চিত করতে হবে। উপকূলীয় মানুষের জন্য টেকসই কর্মসংস্থান ও নিরাপদ জীবনযাপনের বিকল্প নেই।”
সংশ্লিষ্টদের মতে, বরগুনার টেকসই উন্নয়নের জন্য শিল্পায়ন, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা সৃষ্টি, দক্ষতা উন্নয়ন, পর্যটন খাতের বিকাশ এবং জলবায়ু সহনশীল পরিকল্পনা জরুরি। একই সঙ্গে লোকসংস্কৃতি সংরক্ষণ, সাহিত্যচর্চায় পৃষ্ঠপোষকতা বৃদ্ধি ও সাংস্কৃতিক অবকাঠামো গড়ে তোলা গেলে বরগুনা অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক উভয় ক্ষেত্রেই নতুন সম্ভাবনার পথে এগোতে পারবে।
আপনার মতামত লিখুন :