পারিবারিক অস্থিরতার অন্ধকারে ৫০০ টাকার দা’র কোপে শেষ বড় ভাই রাফি


FavIcon
নিজস্ব প্রতিবেদক
  • প্রকাশিত : ১২ আগস্ট, ২০২৫ খ্রিস্টাব্দ

ছবির ক্যাপশন:

আলী মোহাম্মদ :

মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার শান্ত গ্রাম সিদ্ধেশ্বরপুরে গত ৯ আগস্ট ভোরবেলা ভেসে আসে এক ভয়াল সকাল। মেঘলা আকাশের নীরবতার মাঝে ঘুমন্ত অবস্থায় বড় ভাইয়ের গলাকাটা মরদেহ মিলল খাটের উপর। অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই পরিষ্কার হয়ে যায়- এ কোনো বহিরাগত খুনির কাজ নয়, বরং রক্তের বাঁধনে বাঁধা নিজেরই ছোট ভাইয়ের হাতে মৃত্যুর কোপ। আর এই হত্যার জন্ম দিয়েছে মাত্র ৫০০ টাকা ও বহু বছরের জমে থাকা পারিবারিক আগুন।

পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, সেদিন সকালে রহিমপুর ইউনিয়নের সিদ্ধেশ্বরপুর গ্রাম থেকে আব্দুর রহিম রাফি (২৬) ক্ষতবিক্ষত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। খবর পেয়ে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) নোবেল চাকমা, শ্রীমঙ্গল সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার আনিসুর রহমান এবং কমলগঞ্জ থানার ওসি আবু আফর মোঃ মাহফুজুল কবির ঘটনাস্থলে ছুটে যান। গোপন তথ্য, প্রযুক্তি ও স্থানীয় সূত্র মিলিয়ে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ১৬ বছরের কিশোর খুনিকে গ্রেফতার করা হয়- যে সম্পর্কের সংজ্ঞা অনুযায়ী নিহতের আপন ছোট ভাই।

প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে অস্বীকার করলেও, পুলিশের একের পর এক প্রমাণ ও তীক্ষ্ণ প্রশ্নের চাপে ভেঙে পড়ে সে। স্বীকারোক্তিতে বেরিয়ে আসে নৃশংস এক চিত্র হত্যার আগের দিন ৫০০ টাকা চাইতে গিয়ে বড় ভাইয়ের কাছ থেকে না শুধু প্রত্যাখ্যান, বরং গালিগালাজও সহ্য করতে হয় তাকে। ক্ষোভে ফুঁসে ওঠা ছোট ভাই রাতভর প্রতিশোধের আগুন বুকে পুষে রাখে। পরদিন সকালে বাড়ি ফাঁকা পেয়ে খাটের নিচ থেকে লুকানো ধারালো দা বের করে ঘুমন্ত রাফির ঘাড়ে উপর্যুপরি কোপ বসিয়ে দেয়। এরপর রক্তমাখা দা ধুয়ে আগের জায়গায় রেখে দেয়, এমনকি নিজের লুঙ্গি পর্যন্ত লুকিয়ে রাখে- যেন মৃত্যু ছিল শুধু এক নিঃশব্দ অধ্যায়, যার পর আবার জীবনের অভিনয় শুরু করা যায়।

তদন্তে উঠে আসে আরও গভীর তিক্ততা। বাবা মারা যাওয়ার পর রাফি হয়ে ওঠেন পরিবারের একমাত্র অভিভাবক। ছোট ভাইকে মাদ্রাসায় রেখে পড়াশোনা করাতে চাইলেও, তার অনীহা, বাড়িতে অলস সময় কাটানো ও নিয়মিত শাসনের কারণে দুই ভাইয়ের মধ্যে অদৃশ্য দেয়াল তৈরি হয়। এর সঙ্গে যোগ হয় পারিবারিক অমতে রাফির বিয়ে, যা মা, ভাই ও ভাবীর মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী বিরোধের জন্ম দেয়। বছর ধরে জমে থাকা ক্ষোভ, অভিমান আর মানসিক দূরত্ব- সব মিলিয়ে এই হত্যাকাণ্ড যেন ছিল এক অবধারিত বিস্ফোরণ।

গ্রেফতারকৃত কিশোরের স্বীকারোক্তি অনুযায়ী, খাটের নিচ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে হত্যার দা এবং রক্তমাখা লুঙ্গি। এ ঘটনায় নিহতের মা মনোয়ারা বেগম বাদী হয়ে কমলগঞ্জ থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেছেন (মামলা নং-০৫, তারিখ-১০/০৮/২০২৫, ধারা ৩০২/৩৪ পেনাল কোড)।

কমলগঞ্জের এই হত্যাকাণ্ড প্রমাণ করল রক্তের সম্পর্ক কখনও কখনও অন্ধকারের মুখোমুখি হলে, তা সবচেয়ে নির্মম প্রতিশোধে রূপ নিতে পারে।


ad728

আলোচিত শীর্ষ ১০ সংবাদ