অনলাইনে যৌন নিপীড়নের শিকার প্রতি পাঁচ শিশুর একজন : ইউনিসেফ
নিজস্ব প্রতিবেদক
- প্রকাশিত : ০৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
আন্তর্জাতিক ডেস্ক :
বিশ্বের ২১টি দেশে মাত্র এক বছরে ১২ থেকে ১৭ বছর বয়সী প্রায় ২ কোটি শিশু প্রযুক্তির মাধ্যমে কোনো না কোনো ধরনের যৌন নিপীড়ন, শোষণ বা হয়রানির শিকার হয়েছে। অর্থাৎ এসব দেশের ইন্টারনেট ব্যবহারকারী শিশুদের প্রায় প্রতি পাঁচজনের একজন এমন ভয়াবহ অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছে।
জাতিসংঘের শিশু বিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফের নতুন এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এ তথ্য। ‘থ্রু চিলড্রেনস আইজ: হাউ ডিজিটাল টেকনোলজিস এনেবল চাইল্ড সেক্সুয়াল অ্যাবিউজ’ শীর্ষক প্রতিবেদনে শিশুদের ওপর প্রযুক্তিনির্ভর যৌন নিপীড়নের চিত্রের পাশাপাশি ভুক্তভোগীদের অভিজ্ঞতাও তুলে ধরা হয়েছে।
ইউনিসেফের নির্বাহী পরিচালক ক্যাথরিন রাসেল বলেন, গবেষণায় উঠে আসা চিত্র অত্যন্ত উদ্বেগজনক। জরিপে অংশ নেওয়া দেশগুলোতে ২ কোটির বেশি শিশু অনলাইনে অনিচ্ছাকৃত যৌন কনটেন্ট, যৌন হয়রানি বা শোষণের শিকার হয়েছে। অনেক সময় এসব ঘটনা ঘটেছে এমন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে, যেখানে শিশুরা পড়াশোনা করে, খেলাধুলা করে কিংবা বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখে।
তিনি বলেন, ভয় ও অস্বস্তির কারণে অনেক শিশু এসব ঘটনা কাউকে জানায় না। আবার অনেকেই জানে না, সাহায্যের জন্য কোথায় বা কার কাছে যেতে হবে। ফলে তারা নীরবে সেই অভিজ্ঞতার বোঝা বহন করে।
ইউনিসেফের হিসাবে, জরিপে অন্তর্ভুক্ত দেশগুলোতে ১ কোটি ৫০ লাখের বেশি শিশু অনিচ্ছাকৃত যৌন কনটেন্টের মুখোমুখি হয়েছে। প্রায় ৯০ লাখ শিশুকে তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে যৌন কথোপকথনে অংশ নেওয়া কিংবা যৌন ছবি পাঠানোর জন্য চাপ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া প্রায় ৪০ লাখ শিশুর যৌন ছবি তাদের সম্মতি ছাড়া অন্যদের সঙ্গে শেয়ার করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রযুক্তির মাধ্যমে শিশুদের যৌন নিপীড়নের প্রায় ৬০ শতাংশ ঘটনা ঘটেছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, স্ন্যাপচ্যাট, টিকটক ও হোয়াটসঅ্যাপের মতো প্ল্যাটফর্মে এসব ঘটনার বড় অংশ ঘটেছে। আরও প্রায় ১৪ শতাংশ ঘটনা ঘটেছে অনলাইন গেমের মাধ্যমে।
তবে এসব ঘটনায় অপরাধী সবসময় অপরিচিত কেউ ছিল না। বরং ৫৭ শতাংশ ঘটনায় অভিযুক্ত ব্যক্তি শিশুটির পরিচিত ছিল। এর মধ্যে সহপাঠী, বন্ধু, প্রেমের সম্পর্কের ব্যক্তি এবং পরিবারের সদস্যও ছিলেন।
অন্যদিকে, প্রায় ৩৮ শতাংশ শিশু জানিয়েছে, অপরাধীর সঙ্গে তাদের প্রথম যোগাযোগ হয়েছিল অনলাইনে। ভুয়া অ্যাকাউন্ট, ব্যক্তিগত বার্তা ও অন্যান্য ডিজিটাল সুবিধা ব্যবহার করে এসব যোগাযোগ তৈরি করা হয়।
প্রযুক্তির মাধ্যমে যৌন নিপীড়নের শিকার শিশুদের ওপর এর গভীর মানসিক প্রভাব পড়ছে বলেও জানিয়েছে ইউনিসেফ। ভুক্তভোগীরা ভয়, লজ্জা, বিভ্রান্তি ও একাকিত্বের অনুভূতির কথা জানিয়েছে। একই সঙ্গে অন্য মানুষের প্রতি তাদের নিরাপত্তাবোধ ও বিশ্বাসও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, এ ধরনের নিপীড়নের শিকার শিশুরা আত্মহত্যার চিন্তা বা আচরণ এবং আত্মক্ষতির প্রবণতার কথা অন্য শিশুদের তুলনায় চার গুণ বেশি জানিয়েছে। তাদের মধ্যে উদ্বেগের মাত্রাও উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি ছিল।
মেক্সিকো ও মেসিডোনিয়ায় যৌন নিপীড়নের শিকার শিশুদের আত্মহত্যার চিন্তা বা আচরণের ঝুঁকি অন্যদের তুলনায় আট গুণেরও বেশি পাওয়া গেছে। পাকিস্তানে এ ধরনের শিশুদের আত্মক্ষতির ঝুঁকি ছিল সাত গুণের বেশি।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, এসব ঘটনার ৪০ শতাংশের বেশি কখনো কাউকে জানানো হয়নি। পুলিশ, সমাজকর্মী বা হেল্পলাইনের মতো কর্তৃপক্ষের কাছে রিপোর্ট করা হয়েছে ১ শতাংশেরও কম ঘটনা।
ইউনিসেফ বলছে, শিশুদের নীরব থাকার অন্যতম বড় কারণ হলো তারা জানে না কোথায় যেতে হবে বা কাকে বিষয়টি জানাতে হবে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান, পরিবার, স্কুল ও সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে আরও কার্যকর ভূমিকা নিতে হবে।
প্রতিবেদনে শিশুদের ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষা জোরদার, প্রাপ্তবয়স্কদের অনাকাঙ্ক্ষিত যোগাযোগ সীমিত করা এবং অনলাইন প্ল্যাটফর্মের কনটেন্ট ব্যবস্থাকে আরও নিরাপদ করার সুপারিশ করা হয়েছে। একই সঙ্গে যৌন নিপীড়নের ঘটনা শনাক্ত ও রিপোর্টের ব্যবস্থা উন্নত করা, আইন শক্তিশালী করা এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সক্ষমতা বাড়ানোর ওপরও জোর দেওয়া হয়েছে।
ইউনিসেফের নির্বাহী পরিচালক ক্যাথরিন রাসেল বলেন, অনলাইনে শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে আরও বেশি দায়িত্ব নিতে হবে।
প্রতিবেদনটি ২১টি দেশের প্রায় ২১ হাজার ইন্টারনেট ব্যবহারকারী শিশুর ওপর পরিচালিত জাতীয় পর্যায়ের প্রতিনিধিত্বশীল জরিপের ভিত্তিতে তৈরি করা হয়েছে। অংশগ্রহণকারীদের বয়স ছিল ১২ থেকে ১৭ বছর। পাশাপাশি শৈশবে যৌন নিপীড়নের শিকার হওয়া ১০০ তরুণের সঙ্গে বিস্তারিত সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়েছে।
তবে ইউনিসেফ সতর্ক করে বলেছে, এই জরিপের ফলাফল সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর ইন্টারনেট ব্যবহারকারী শিশুদের প্রতিনিধিত্ব করে, সব শিশুকে নয়। বিশেষ করে যেসব দেশে ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ তুলনামূলক কম, সেখানে সামগ্রিক শিশু জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে এই পরিসংখ্যান সরাসরি প্রযোজ্য নয়।
আপনার মতামত লিখুন :