প্রবাসীদের ঘামে সমৃদ্ধ বাংলাদেশ, রেমিট্যান্সই দেশের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি


FavIcon
নিজস্ব প্রতিবেদক
  • প্রকাশিত : ১৫ জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

ছবির ক্যাপশন:

নিজস্ব প্রতিবেদক :

হাজার হাজার মাইল দূরে, ভিন্ন ভাষা ও ভিন্ন সংস্কৃতির দেশে প্রতিদিন ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত নিরলস পরিশ্রম করছেন বাংলাদেশের লাখো প্রবাসী। প্রখর রোদে নির্মাণকাজ, কারখানার ভারী শ্রম, কৃষিখামার, হোটেল-রেস্তোরাঁ কিংবা গৃহপরিচর্যার মতো কঠিন পেশায় নিয়োজিত এসব মানুষ নিজের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য বিসর্জন দিয়ে পরিবার ও দেশের ভবিষ্যৎ গড়ার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। তাদের পাঠানো রেমিট্যান্স আজ বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান শক্তি।

প্রবাস জীবন অনেকের কাছে স্বপ্নের হলেও বাস্তবে তা কঠিন সংগ্রামের নাম। দিনের পর দিন ১০ থেকে ১৪ ঘণ্টা কাজ, সীমিত আয়, কর্মস্থলের অনিশ্চয়তা, দুর্ঘটনার ঝুঁকি, ভাষাগত সমস্যা এবং পরিবার থেকে বছরের পর বছর দূরে থাকার কষ্ট তাদের প্রতিদিনের সঙ্গী। ঈদ, কোরবানির উৎসব কিংবা সন্তানের জন্মদিন—সব আনন্দ থেকে দূরে থেকেও তারা দেশের জন্য বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করে যাচ্ছেন।

অনেক প্রবাসী বাবা-মায়ের শেষ বিদায়ে উপস্থিত থাকতে পারেন না। সন্তান বড় হয়ে যায় বাবার স্নেহ ছাড়াই। অনেক মা বছরের পর বছর সন্তানের মুখ শুধু মোবাইল ফোনের পর্দায় দেখেন। এই আত্মত্যাগের বিনিময়েই টিকে আছে অসংখ্য পরিবারের স্বপ্ন।

রেমিট্যান্সে সচল অর্থনীতির চাকা

প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স দেশের বৈদেশিক মুদ্রার অন্যতম প্রধান উৎস। প্রতি বছর বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার দেশে আসে, যা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী করতে, আমদানি ব্যয় মেটাতে এবং অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

রেমিট্যান্সের অর্থে দেশের লাখো পরিবার ঘর নির্মাণ করছে, সন্তানদের উচ্চশিক্ষার সুযোগ সৃষ্টি করছে, কৃষি ও ক্ষুদ্র ব্যবসায় বিনিয়োগ করছে এবং জীবনমান উন্নত করছে। গ্রামের বাজার থেকে শুরু করে শহরের ব্যবসা-বাণিজ্য—সবখানেই এই অর্থের ইতিবাচক প্রভাব দৃশ্যমান।

সরকারের লাভ কোথায়?

প্রবাসীদের পাঠানো বৈদেশিক মুদ্রা সরকারের জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। এই অর্থ দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধি করে, শিল্পের কাঁচামাল, জ্বালানি, খাদ্যপণ্য ও প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি আমদানিতে সহায়তা করে। পাশাপাশি বড় বড় অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়ন, বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ এবং আর্থিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতেও রেমিট্যান্স গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, রেমিট্যান্স দেশের মুদ্রাবাজারকে স্থিতিশীল রাখতে, বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত করতে এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে ত্বরান্বিত করতে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখে।

যে সম্মান প্রাপ্য, তা কি পাচ্ছেন প্রবাসীরা?

অর্থনীতিতে এত বড় অবদান রাখলেও অনেক প্রবাসী বিদেশে নানা ধরনের হয়রানি, প্রতারণা এবং কর্মক্ষেত্রে বৈষম্যের শিকার হন। দেশে ফিরে অনেকেই পুনর্বাসন, বিনিয়োগ কিংবা কর্মসংস্থানের পর্যাপ্ত সুযোগ পান না। দক্ষতা উন্নয়ন, নিরাপদ অভিবাসন, স্বল্প ব্যয়ে বৈধ পথে বিদেশে কর্মসংস্থান এবং প্রবাসীদের জন্য সহজ ব্যাংকিং সেবা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।

প্রবাসীরা শুধু অর্থ পাঠান না, পাঠান স্বপ্নও

বাংলাদেশের উন্নয়নের প্রতিটি ধাপে প্রবাসীদের ঘাম, শ্রম ও আত্মত্যাগের ছাপ রয়েছে। তাদের পাঠানো প্রতিটি টাকার পেছনে লুকিয়ে থাকে অগণিত কষ্ট, দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, প্রিয়জনকে ছেড়ে থাকার বেদনা এবং দেশের প্রতি অগাধ ভালোবাসা।

আজ সময় এসেছে এই নীরব অর্থযোদ্ধাদের যথাযথ সম্মান, নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করার। কারণ, প্রবাসীদের ঘামে অর্জিত প্রতিটি রেমিট্যান্স শুধু একটি পরিবারের ভাগ্য বদলায় না; বদলে দেয় বাংলাদেশের অর্থনীতির ভবিষ্যৎও।

প্রবাসীরা দেশের রেমিট্যান্স যোদ্ধা। তাদের কষ্টের প্রতিটি ফোঁটা ঘামই বাংলাদেশের অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করে। তাদের সম্মান ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই হোক রাষ্ট্র ও সমাজের অঙ্গীকার।


ad728

আলোচিত শীর্ষ ১০ সংবাদ