আহমাদিনেজাদকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েলের গোপন ছক উন্মোচিত!
নিজস্ব প্রতিবেদক
- প্রকাশিত : ২১ মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
আন্তর্জাতিক ডেস্ক :
ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সংঘাত শুরুর পর থেকেই তাদের মূল লক্ষ্য ছিল তেহরানের শাসনব্যবস্থায় পরিবর্তন আনা। যুদ্ধের প্রাথমিক ধাপেই সর্বোচ্চ নেতা ও শীর্ষ কর্মকর্তাদের হত্যার পর এবার দেশটির সাবেক প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আহমাদিনেজাদ-কে সামনে এনে নতুন নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা করা হয়েছিল বলে জানিয়েছে মার্কিন গণমাধ্যম।
মার্কিন কর্মকর্তাদের উদ্ধৃতি দিয়ে The New York Times এক প্রতিবেদনে জানায়, যুদ্ধের শুরুতে ইসরায়েল একটি বিশেষ সামরিক অভিযান চালায়। এর উদ্দেশ্য ছিল তেহরানে গৃহবন্দি অবস্থায় থাকা আহমাদিনেজাদকে মুক্ত করা। পরিকল্পনাটি সফল হলে তাকে সামনে রেখে ইরানের রাজনৈতিক ক্ষমতার ভারসাম্যে বড় ধরনের পরিবর্তন আনার চেষ্টা করা হতে পারত বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
প্রতিবেদনে বলা হয়, সংঘাতের শুরুর দিকেই ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনি ও শীর্ষ কর্মকর্তারা নিহত হওয়ার কয়েক দিন পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রকাশ্যে মন্তব্য করেন, ইরানের ক্ষমতা যদি ‘ভেতরের কেউ’ গ্রহণ করত, সেটাই সবচেয়ে ভালো হতো। পরবর্তী সময়ে জানা যায়, এই মন্তব্যের পেছনে একটি নির্দিষ্ট পরিকল্পনা ছিল।
মার্কিন কর্মকর্তারা জানান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল শুরু থেকেই এমন একজন ‘বাস্তববাদী’ ব্যক্তিত্ব খুঁজছিল, যিনি ইরানের ক্ষমতা নিতে পারেন। সেই প্রেক্ষাপটে বিস্ময়করভাবে সামনে আসে আহমাদিনেজাদের নাম। যদিও তিনি দীর্ঘদিন ধরে প্রকাশ্যভাবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলবিরোধী অবস্থানের জন্য পরিচিত।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, যুদ্ধের প্রথম দিনেই তেহরানে আহমাদিনেজাদের বাড়িতে ইসরায়েলি হামলা চালানো হয়। হামলায় তিনি আহত হন বলে তার এক সহযোগীর বরাতে দাবি করা হয়েছে। ওই হামলার উদ্দেশ্য ছিল তাকে গৃহবন্দি অবস্থা থেকে মুক্ত করা। ঘটনার পর থেকে তাকে আর প্রকাশ্যে দেখা যায়নি এবং তার বর্তমান অবস্থানও অজানা।
মার্কিন কর্মকর্তারা দাবি করেন, এই পরিকল্পনার বিষয়ে আহমাদিনেজাদকেও অবহিত করা হয়েছিল। তবে তিনি এতে সম্মতি দিয়েছিলেন কি না, সে বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য নেই। একই সঙ্গে কেন তাকে সম্ভাব্য শীর্ষ নেতা হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছিল, সে প্রশ্নেরও স্পষ্ট জবাব মেলেনি।
নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইসরায়েলের পরিকল্পনা ছিল ধাপে ধাপে ইরানের সরকারকে দুর্বল করা। প্রথম ধাপে বিমান হামলা ও শীর্ষ নেতাদের হত্যার মাধ্যমে রাষ্ট্রযন্ত্রে অস্থিরতা সৃষ্টি, পাশাপাশি কুর্দি গোষ্ঠীগুলোকে সক্রিয় করার চেষ্টা করা হয়। পরবর্তী ধাপে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতির মাধ্যমে বিকল্প সরকার প্রতিষ্ঠার চিন্তা ছিল। তবে বিমান হামলা ও খামেনি হত্যার বাইরে পরিকল্পনার বড় অংশ বাস্তবায়িত হয়নি।
এ বিষয়ে হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র আনা কেলি বলেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প শুরু থেকেই ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’র লক্ষ্য স্পষ্ট করেছিলেন। তার ভাষায়, এই অভিযানের উদ্দেশ্য ছিল ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস, উৎপাদন কেন্দ্র ভেঙে দেওয়া এবং প্রতিরক্ষাব্যবস্থা দুর্বল করা।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ট্রাম্প আগে ভেনিজুয়েলার নেতা নিকোলাস মাদুরোকে অপহরণের মার্কিন অভিযানে সন্তুষ্ট ছিলেন এবং সেই মডেল অন্য দেশেও প্রয়োগ করা সম্ভব বলে মনে করতেন। তবে এ বিষয়ে ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।
উল্লেখ্য, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আহমাদিনেজাদ ইরানের শাসকগোষ্ঠীর সঙ্গে প্রকাশ্য দ্বন্দ্বে জড়ান এবং দুর্নীতির অভিযোগ তোলেন। একাধিকবার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে অংশ নিতে চাইলেও তাকে অযোগ্য ঘোষণা করা হয়। তার সহযোগীদের গ্রেপ্তার করা হয় এবং তাকে তেহরানের নারমাক এলাকার বাড়িতে সীমাবদ্ধ করে রাখা হয়েছিল। বিশ্লেষকদের মতে, এই রাজনৈতিক বিচ্ছিন্নতাই তাকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের কাছে সম্ভাব্য বিকল্প হিসেবে তুলে ধরেছিল।
নিউইয়র্ক টাইমসকে আহমাদিনেজাদের এক সহযোগী বলেন, অদূর ভবিষ্যতে ইরানে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারতেন। যুক্তরাষ্ট্র তাকে ভেনিজুয়েলার অন্তর্বর্তী নেতৃত্বের মতো একটি সম্ভাব্য মুখ হিসেবে দেখছিল বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
আপনার মতামত লিখুন :