দেশজুড়ে বন্যার তাণ্ডবে ১০ জেলায় বিপর্যস্ত জনজীবন, লাখো মানুষ পানিবন্দি


FavIcon
নিজস্ব প্রতিবেদক
  • প্রকাশিত : ১৪ জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

ছবির ক্যাপশন:

নিজস্ব প্রতিবেদক :

টানা ভারী বর্ষণ, উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল এবং নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় দেশের দক্ষিণ-পূর্ব ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের অন্তত ১০ জেলায় বন্যা পরিস্থিতি এখনও উদ্বেগজনক। কোথাও পাহাড়ধস, কোথাও নদীর বাঁধ উপচে লোকালয়ে পানি প্রবেশ, আবার কোথাও যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় লাখো মানুষ চরম দুর্ভোগে পড়েছেন। সরকারি হিসাবে এ পর্যন্ত ১০ লাখের বেশি মানুষ বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন এবং ৫১ জনের মৃত্যুর তথ্য নথিভুক্ত হয়েছে। ২ লাখ ৬৭ হাজারের বেশি পরিবার পানিবন্দি রয়েছে এবং ৩৮ হাজারের বেশি মানুষ আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থান করছেন।

মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) সচিবালয়ে বন্যা পরিস্থিতি নিয়ে আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠক শেষে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু বলেন, "এখনও বন্যার ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ হিসাব নিরূপণ করা হয়নি। বর্তমানে সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার উদ্ধার, ত্রাণ বিতরণ, চিকিৎসাসেবা এবং দুর্গত মানুষের পুনর্বাসন নিশ্চিত করা।"

মন্ত্রী জানান, বন্যাদুর্গতদের সহায়তায় সরকারের পক্ষ থেকে ১ কোটি টাকা এবং প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিল থেকে আরও ২০ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। কৃষি, সড়ক, সেতু, শিক্ষা ও জনপদের অবকাঠামোর ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ করে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলো প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে। বন্যার পানি নেমে গেলে জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ ক্ষয়ক্ষতির তালিকা প্রস্তুত করা হবে। তিনি আরও বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বন্যাকবলিত এলাকা পরিদর্শনে যাবেন।

সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত যেসব জেলা

চট্টগ্রাম: নগরী ও জেলার বিভিন্ন উপজেলা এখনও জলাবদ্ধ। বহু গ্রামের ঘরবাড়ি পানিতে তলিয়ে গেছে। সড়ক ও সেতুর ক্ষতি হওয়ায় যোগাযোগ ব্যাহত। পাহাড়ধসের ঘটনাও ঘটেছে। বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্নতায় দুর্ভোগ বেড়েছে।

কক্সবাজার: জেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত। রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরেও পাহাড়ধস ও জলাবদ্ধতায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। বহু পরিবার নিরাপদ আশ্রয়ে রয়েছে এবং জরুরি খাদ্য ও চিকিৎসা সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।

বান্দরবান: পাহাড়ি ঢল ও ভারী বর্ষণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত জেলার একটি। বহু গ্রাম বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। পাহাড়ধসে প্রাণহানি এবং সড়ক যোগাযোগ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

রাঙামাটি: কাপ্তাই হ্রদের আশপাশ ও নিম্নাঞ্চলে পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। বিভিন্ন সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় দুর্গম এলাকায় ত্রাণ পৌঁছাতে বেগ পেতে হচ্ছে।

খাগড়াছড়ি: পাহাড়ি ঢল ও অতিবৃষ্টিতে গ্রামীণ সড়ক, সেতু ও কৃষিজমির ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। অনেক পরিবার আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থান করছে।

মৌলভীবাজার: মনু নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। ঘরবাড়ি, ফসলি জমি ও মাছের ঘের ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

হবিগঞ্জ: খোয়াই নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় বিভিন্ন উপজেলা প্লাবিত হয়েছে। সড়ক যোগাযোগ ও বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যাহত হয়েছে।

সুনামগঞ্জ: কুশিয়ারা নদীর পানি বৃদ্ধি এবং নিম্নাঞ্চলে জলাবদ্ধতায় হাওর এলাকার মানুষ দুর্ভোগে রয়েছেন। কৃষিজমি ও গ্রামীণ অবকাঠামোর ক্ষতি হয়েছে।

সিলেট: জেলার বিভিন্ন নিম্নাঞ্চলে পানি জমে রয়েছে। অনেক পরিবার আশ্রয়কেন্দ্রে রয়েছে। বিশুদ্ধ পানি ও স্যানিটেশন সংকট দেখা দিয়েছে।

কুমিল্লা: জেলার কয়েকটি নিম্নাঞ্চলে বন্যার পানি প্রবেশ করে বসতবাড়ি ও কৃষিজমির ক্ষতি করেছে। স্থানীয় প্রশাসন ত্রাণ বিতরণ অব্যাহত রেখেছে।

কৃষি ও অবকাঠামোতে বড় ক্ষতি

বন্যার পানিতে হাজার হাজার হেক্টর আমন বীজতলা, সবজি ক্ষেত, পানের বরজ ও মৎস্য খামার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বহু কাঁচা-পাকা সড়ক, কালভার্ট ও সেতু ভেঙে যাওয়ায় দুর্গত এলাকায় ত্রাণ পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়েছে। অনেক এলাকায় বিদ্যুৎ ও মোবাইল নেটওয়ার্কও বিঘ্নিত রয়েছে।

সরকারের ত্রাণ ও উদ্ধার কার্যক্রম

সরকারের পাশাপাশি সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী, কোস্টগার্ড, ফায়ার সার্ভিস, পুলিশ, জেলা প্রশাসন এবং বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। দুর্গত এলাকায় শুকনো খাবার, বিশুদ্ধ পানি, ওষুধ, শিশুখাদ্য এবং চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে সবাইকে আশ্রয়কেন্দ্রে থাকার এবং নদীর পানি ও আবহাওয়ার সর্বশেষ সতর্কতা অনুসরণ করার আহ্বান জানানো হয়েছে।

আবহাওয়া অধিদপ্তর ও বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানিয়েছে, কয়েকটি নদীর পানি এখনও বিপৎসীমার কাছাকাছি বা ওপরে রয়েছে। তবে কিছু এলাকায় পানি কমতে শুরু করেছে। এরপরও নিম্নাঞ্চলে জলাবদ্ধতা ও দুর্ভোগ অব্যাহত থাকায় সতর্কতা বজায় রাখতে বলা হয়েছে।


ad728

আলোচিত শীর্ষ ১০ সংবাদ