বরগুনায় ডাকবাংলোতে মা ও দুই কন্যার রহস্যজনক মৃত্যু, সুষ্ঠু তদন্তের দাবিতে বিক্ষোভ
নিজস্ব প্রতিবেদক
- প্রকাশিত : ০৫ জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
জাকিয়া সুলতানা, বরগুনা জেলা প্রতিনিধি :
বরগুনা জেলা পরিষদের ডাকবাংলো থেকে এক নারী ও তাঁর দুই কন্যার মরদেহ উদ্ধারের ঘটনাকে কেন্দ্র করে পুরো জেলায় চরম চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। ঘটনার একদিন পর রহস্য উদঘাটন, সুষ্ঠু তদন্ত এবং দায়ীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল, সড়ক অবরোধ ও সমাবেশ করেছে স্থানীয় সনাতন ধর্মাবলম্বীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ।
বৃহস্পতিবার (৪ জুন) বিকেল ৫টার দিকে বরগুনা শহরের কালীবাড়ি এলাকা থেকে একটি বিক্ষোভ মিছিল বের হয়। মিছিলটি শহরের প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে বরগুনা প্রেসক্লাবের সামনে গিয়ে সমাবেশে মিলিত হয়। এ সময় কিছুক্ষণ সড়ক অবরোধ করা হলে শহরের যান চলাচল ব্যাহত হয়। এর আগে বরগুনা জেনারেল হাসপাতালের মর্গের সামনেও নিহতদের মরদেহ নিয়ে বিক্ষোভ মিছিল করেন স্বজন ও স্থানীয়রা।
বিক্ষোভকারীরা দাবি করেন, জেলা পরিষদের খণ্ডকালীন পরিচ্ছন্নতাকর্মী ইতি রানী ও তাঁর দুই কন্যা আরাধা বিশ্বাস এবং অনুরাধা বিশ্বাসের মৃত্যুর প্রকৃত রহস্য উদঘাটন করতে হবে। একই সঙ্গে ডাকবাংলোর সিসিটিভি ফুটেজ প্রকাশ, নিরপেক্ষ তদন্ত এবং জড়িতদের দ্রুত আইনের আওতায় আনার দাবি জানান তারা।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বুধবার (৩ জুন) বেলা ১১টার দিকে ইতি রানী তাঁর দুই মেয়েকে নিয়ে জেলা পরিষদ ডাকবাংলোতে কাজে আসেন। বিকেলে দীর্ঘ সময় তাদের কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে অন্য কর্মীরা বিষয়টি পুলিশকে জানান। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে ডাকবাংলোর তৃতীয় তলার দুটি কক্ষ থেকে তিনজনের মরদেহ উদ্ধার করে।
৩ নম্বর কক্ষের একটি বিছানা থেকে বড় মেয়ে আরাধা বিশ্বাসের মরদেহ এবং ভেতর থেকে বন্ধ থাকা ৪ নম্বর কক্ষের দরজা ভেঙে মা ইতি রানী ও ছোট মেয়ে অনুরাধা বিশ্বাসের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
নিহত ইতি রানী (৩৪) বরগুনা পৌরসভার কালীবাড়ি সড়ক এলাকার দুলাল চন্দ্র বিশ্বাসের স্ত্রী। তাঁর বড় মেয়ে আরাধার বয়স আনুমানিক ১১ বছর এবং ছোট মেয়ে অনুরাধার বয়স প্রায় ৩ বছর। ঘটনাস্থল থেকে ঘুমের ওষুধের খালি পাতা ও পানির বোতল উদ্ধার করা হয়েছে। তবে এটি আত্মহত্যা নাকি হত্যাকাণ্ড, সে বিষয়ে এখনো নিশ্চিত হতে পারেনি পুলিশ।
নিহতের স্বামী দুলাল চন্দ্র বিশ্বাস জানান, পরিবারে বড় কোনো কলহ ছিল না, তবে কিছু আর্থিক সংকট ছিল। এ অবস্থায় স্বজন ও স্থানীয়দের একটি অংশ ঘটনার পেছনে অন্য কোনো কারণ রয়েছে কি না, তা গভীরভাবে তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।
সমাবেশে বক্তারা বলেন, একটি সরকারি স্থাপনার ভেতরে মা ও দুই শিশুর এমন রহস্যজনক মৃত্যু কোনোভাবেই স্বাভাবিক ঘটনা হতে পারে না। সিসিটিভি ফুটেজ যথাযথভাবে বিশ্লেষণ করে ঘটনার সময় অন্য কারও যাতায়াত ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখতে হবে।
বরগুনা সদর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. আলীম বলেন, ময়নাতদন্ত শেষে মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে এবং থানায় একটি ইউডি মামলা দায়ের হয়েছে। ভিসেরা রিপোর্ট পাওয়ার পর আইন অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ঘটনার পর থেকে জেলা পুলিশের একাধিক টিম ও গোয়েন্দা পুলিশ তদন্তে নেমেছে। পুলিশ জানিয়েছে, রিপোর্ট হাতে না পাওয়া পর্যন্ত মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে চূড়ান্তভাবে কিছু বলা সম্ভব নয়।
এ মর্মান্তিক ঘটনায় শোক ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে পুরো বরগুনাজুড়ে। মা ও দুই শিশুর এই করুণ মৃত্যুর প্রকৃত রহস্য উদঘাটন এবং ন্যায়বিচারের প্রত্যাশায় এখন তাকিয়ে আছে নিহত পরিবারের স্বজনসহ পুরো জেলা।
আপনার মতামত লিখুন :