ইরানের ভেতর থেকে যেভাবে যুক্তরাষ্ট্র বিমানসেনা উদ্ধার করতে সক্ষম হল


FavIcon
নিজস্ব প্রতিবেদক
  • প্রকাশিত : ০৭ এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

ছবির ক্যাপশন:

আন্তর্জাতিক ডেস্ক :

ইরানে হামলা চালাতে গিয়ে ভূপাতিত এফ–১৫ই স্ট্রাইক ইগল যুদ্ধবিমানের দুই ক্রুকেই উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। তবে এজন্য চালাতে হয় অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ সামরিক অভিযান। হারাতে হয় উচ্চ প্রযুক্তির দুটি সামরিক বিমান এবং একটি হেলিকপ্টার। 

ভূপাতিত যুদ্ধবিমানের পাইলটকে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে উদ্ধার করা গেলেও, দ্বিতীয় বিমান সেনাকে ইরানের বাইরে নিয়ে আসতে রীতিমতো এক যুদ্ধ আয়োজন সাজাতে হয়েছিল।

যুক্তরাষ্ট্রের স্পেশাল ফোর্সের কয়েকশ সদস্য অংশ নেন অভিযানে। ইরানের ভিতরেই একটি পরিত্যক্ত এয়ারফিল্ডকে কবজায় নিয়ে প্রায় ২৪ ঘণ্টার জন্য ‘অস্থায়ী’ সেনাঘাঁটিতে পরিণত করা হয়। 

একজন বিমান সেনাকে উদ্ধারের জন্য চরম ঝুঁকিপূর্ণ এই অভিযানকে সমর ইতিহাসের অন্যতম জটিল এক অপারেশন হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য ডেইলি মেইলে অভিযানের সময়কার ঘটনাপ্রবাহ তুলে ধরা হয়েছে।

সামরিক ইতিহাসের অন্যতম দুঃসাহসিক অভিযান

দ্বিতীয় বিমান সেনা (একজন কর্নেল) সেফটি হারনেস খুলে ক্ষতবিক্ষত ইজেক্টর সিট থেকে সাবধানে নিজেকে বের করে আনলেন। তবে সেই সময়টি ছিল অজানা এক ভয়ংকর অধ্যায়ের শুরুমাত্র। 

কয়েক মিনিট আগেও যুক্তরাষ্ট্র বিমানবাহিনীর এই জ্যেষ্ঠ উইপনস সিস্টেমস কর্মকর্তা একটি এফ-১৫ স্ট্রাইক ঈগলের ককপিটে ছিলেন। দক্ষিণ-পশ্চিম ইরানের আকাশে ঘণ্টায় সেটি দেড় হাজার মাইলেরও বেশি গতিতে উড়ছিল।

হঠাৎ বিমানটি শত্রুপক্ষের গুলিতে বিধ্বস্ত হয়। ২০০৩ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধের পর এটাই প্রথম যুক্তরাষ্ট্রের কোনো যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হওয়ার ঘটনা। 

ঘটনার পর এই বিমানসেনা ইরানের কোহগিলুয়েহ ও বয়ার-আহমদ প্রদেশের এক জনবিরল পার্বত্য অঞ্চলে আটকা পড়েন। পারস্য উপসাগর থেকে জায়গাটির দূরত্ব ৩০ মাইলেরও বেশি। 

দিনটি ছিল শুক্রবার।

পড়ন্ত বিকেলে দুর্ভেদ্য শত্রু অবস্থানের ভেতরে তিনি ছিলেন সম্পূর্ণ একা। তার সবচেয়ে কাছের সঙ্গী ছিলেন এফ-১৫ বিমানটির পাইলট। বিধ্বস্ত বিমান ভূপৃষ্ঠ স্পর্শ করার আগে তিনিও হলুদ ‘ইজেক্ট’ লিভার টেনেছিলেন। 
তবে দ্বিতীয় বিমান সেনার চেয়ে পাইলট ছিলেন তুলনামূলক বেশি ভাগ্যবান। প্যারাস্যুটের সাহায্যে তিনি বিধ্বস্ত বিমান থেকে কিছুটা দূরে সমতল ভূমিতে অবতরণ করতে সক্ষম হন। যুক্তরাষ্ট্রের একটি সামরিক হেলিকপ্টার এর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তাকে চিহ্নিত করে উদ্ধারে সক্ষম হয়।

আরেক বিমানসেনার জন্য ভাগ্য অতটা প্রসন্ন ছিল না। তার অবতরণের জায়গাটি ছিল বেশ কিছুটা দূরে। এমনকি বিমান থেকে ইজেক্টের সময় তিনি ‘গুরুতর আহত’ হন। যুদ্ধবিমান থেকে বেরিয়ে আসা সব সময়েই বেশ ঝুঁকিপূর্ণ। অনেক সময়েই ক্রুর হাত-পায়ের হাড় ভেঙে যাওয়ার ঘটনা ঘটে, এমনকি মেরুদণ্ডের গুরুতর ক্ষতিও বিরল নয়। 

দ্বিতীয় বিমান সেনা হাঁটতে পারলেও প্রচণ্ড ব্যথায় কাতর ছিলেন। মানসিকভাবে ছিলেন ভীষণ বিপর্যস্ত। এমন সংকটময় পরিস্থিতিতে যুদ্ধবিমান সেনাদের কী করতে হবে সেটা প্রশিক্ষণের সময়েই শেখানো হয়। এসইআরই (সিয়ার) নামের কৌশলটি হলো- সারভাইভাল, ইভেইশন, রেজিস্ট্যান্স অ্যান্ড এস্কেপ; অর্থাৎ ‘বেঁচে থাকা, শত্রুর চোখ এড়িয়ে চলা, প্রতিরোধ এবং পালানো।

আহত বিমান সেনা প্রথমেই ফ্লাইট স্যুটের সারভাইভাল ভেস্টে থাকা মেডিক্যাল কিট দিয়ে নিজের প্রাথমিক চিকিৎসা করেন। এরপর তার প্রথম কাজ ছিল অবতরণস্থল থেকে দ্রুত দূরে সরে যাওয়া। ইজেক্টর সিট অবতরণের জায়গাটি অনেক দূর থেকেও কারো চোখে ধরা পড়া সম্ভব। তাই যতটা সম্ভব দূরে সরে যাওয়ার ওপর তিনি জোর দিয়েছিলেন।

এরপরের সাধারণ নিয়ম হলো, কাছের সবচেয়ে নির্জন কোনো এলাকায় লুকিয়ে পড়া। এই বিমান সেনার জন্য তেমন গন্তব্যটি ছিল বরফঢাকা এক পর্বতচূড়া। এজন্য সন্ধ্যা ও রাতের অনেকটা সময় ধরে তাকে কষ্টকর এক অভিযাত্রায় নামতে হয়।  

বিমান সেনার সারভাইভাল ভেস্টে ছিল একটি ছুরি, পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট, হাল্কা কিছু খাদ্য এবং একটি সিগ সাউয়ার এম১৮ পিস্তল। আর ছিল একটি কম্পাস এবং শত্রু চোখ এড়িয়ে চলার উপযোগী এক মানচিত্র। মিশন ব্রিফিংয়ের সময় এই মানচিত্রটি তাকে ধরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। 

তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল একটি ছোট যন্ত্র, যার নাম ‘কমব্যাট সারভাইভার ইভেশন লোকেটর’ বা সিএসইএল। বোয়িং নির্মিত যন্ত্রটি দেখতে খানিকটা ওয়াকি-টকির মতো। এর সংক্ষিপ্ত এনক্রিপ্টেড বার্তার মাধ্যমে জীবিত ব্যক্তি তার মিশন কমান্ডে নিজের অবস্থান ও অবস্থা সম্পর্কে জানাতে পারেন।

ওয়াশিংটন ডিসির স্থানীয় সময় দুপুরে (ইরানের সন্ধ্যা সাড়ে ৭টা) সিএসইএল থেকে প্রথম বার্তাটি পায় কর্তৃপক্ষ। প্রাথমিক ‘পিং’-এর পর যন্ত্রটি কয়েক ঘণ্টার জন্য নীরব হয়ে যায়। ব্যাটারির সংরক্ষণ এবং শত্রুপক্ষের গোয়েন্দা বাহিনীর নজরদারি এড়াতে সাধারণত এমন কৌশল নেয়া হয়। 

প্রথম বার্তা পাওয়ার পরপরই জীবিত বিমান সেনাকে উদ্ধারে বিশাল তল্লাশি অভিযানের প্রস্তুতি নিতে শুরু করে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কমান্ড। এর মাঝেই তাকে ধরিয়ে দেওয়ার বিনিময়ে ৬০ হাজার ডলার পুরস্কার ঘোষণা করে ইরানি কর্তৃপক্ষ। 

ইরানের রাষ্ট্রায়ত্ত টেলিভিশন শনিবার সকালে পার্বত্য অঞ্চলে সশস্ত্র মিলিশিয়াদের ঢল নামার দৃশ্য সম্প্রচার করে। দাবি করা হয়, পুরস্কারের ঘোষণার পর লুকিয়ে থাকা বিমান সেনার খোঁজে সাধারণ ইরানিরাও নেমে পড়েছেন। 

তবে আহত বিমানসেনা ততক্ষণে লুকিয়ে থাকার একটি ভালো জায়গা পেয়ে গিয়েছিলেন। ধারণা করা হয়, শুক্রবার রাতের অন্ধকারে তিনি পর্বতের গা বেয়ে প্রায় ৭ হাজার ফুট উপরে উঠে যান। এরপর একটি দুর্গম জায়গায় আত্মগোপন করেন। দিনের আলোতেও জায়গাটি খুঁজে পাওয়া ছিল কঠিন।

এরপর তার সিএসইএল আরেকটি ‘পিং’ ব্যবহার করে মিশন কন্ট্রোলকে নতুন অবস্থান জানিয়ে দেয়। বার্তাগুলো এক পর্যায়ে উদ্ধারকারীদের মধ্যে কিছুটা সন্দেহ সৃষ্টি করেছিল। ইরানিদের পাতা ফাঁদে পড়তে যাচ্ছেন কিনা এমন সংশয়ও তৈরি হয়। তবে সিআইএ শেষপর্যন্ত তার সঠিক পরিচয় ও অবস্থান নির্ধারণ করতে সক্ষম হয়।

এর পরেই দ্রুত এগোতে থাকে চূড়ান্ত অপারেশনের প্রস্তুতি। নির্দিষ্ট এলাকাটি নিরাপদ রাখতে আকাশে টহল দিতে শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র অনেকগুলো চালকবিহীন রিপার ড্রোন। গোয়েন্দা সূত্র জানায়, বিমান সেনার অবস্থানের তিন মাইলের মধ্যে আসা যেকোনো যুদ্ধক্ষম পুরুষকে এ সময় ‘নিষ্ক্রিয়’ করা হয়। 

যুক্তরাষ্ট্রের এ-১০ ওয়ারথগ যুদ্ধবিমানও একাধিক মিশন পরিচালনা করে। বিমান সেনার অবস্থানের কাছাকাছি পৌঁছানোর কয়েকটি রাস্তায় প্রতিবন্ধকতা তৈরির পাশাপাশি যোগাযোগ টাওয়ার ধ্বংস এবং বিভিন্ন যানবাহনে হামলা চালানো হয়। ইরানি কর্তৃপক্ষ জানায়, এসব হামলায় অন্তত চারজন নিহত হন। 

যুক্তরাষ্ট্রের মিশন কমান্ডের শীর্ষ কর্মকর্তারা শনিবারজুড়ে এক দুঃসাহসী উদ্ধার পরিকল্পনা তৈরি করেন। হোয়াইট হাউসের সিচুয়েশন রুম থেকে সরাসরি এর তদারকি করা হয়।

প্রথম ধাপেই ছিল ইরানি কর্তৃপক্ষকে বিভ্রান্ত করার জন্য সম্ভাব্য সব আয়োজন। যুক্তরাষ্ট্রের একাধিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, সিআইএ শুরুতে একটি ‘প্রতারণামূলক অভিযান’ অভিযানের গুজব ছড়িয়ে দেয়। অন্য একটি অবস্থানের কথা প্রচার করে দাবি করা হয়, বিমান সেনা সেখান লুকিয়ে আছেন। সেখানে অভিযান চালিয়ে স্থলপথে তাকে সরিয়ে আনার পরিকল্পনা করা হয়েছে। 

এই প্রচার ইরান কর্তৃপক্ষকে বিভ্রান্ত করতে পেরেছিল কি না তা স্পষ্ট নয়। একইভাবে মূল অভিযানের অনেক সূক্ষ্ম বিবরণও এখনো পরিষ্কার নয়। তবে প্রাথমিক ইঙ্গিত বলছে, অভিযানে যুক্তরাষ্ট্র সামরিক বাহিনীর সবচেয়ে ভয়ংকর কয়েকশ সেনা অংশ নেন। তাদের মধ্যে ছিলেন নেভি সিলস, ডেল্টা ফোর্স অপারেটর এবং ২৪তম স্পেশাল ট্যাকটিকস স্কোয়াড্রনের প্যারা-রেসকিউম্যানরা।

কমান্ডোদের সি-১৩০জে পরিবহন বিমানে চড়িয়ে উদ্ধারস্থলের কাছাকাছি জায়গায় পৌঁছে দেয়া হয়। এই বিমানে ১৬০তম স্পেশাল অপারেশনস অ্যাভিয়েশন রেজিমেন্টের এমএইচ-৬ লিটল বার্ড হেলিকপ্টারও ছিল। ইউনিটটি ‘নাইট স্টকার্স’ নামে পরিচিত এবং তারা ২০১১ সালে ওসামা বিন লাদেনকে হত্যার মিশনেও অংশ নেয়।

লিটল বার্ড হেলিকপ্টারগুলো কমান্ডোদের পর্বতের নির্দিষ্ট জায়গায় উড়িয়ে নিয়ে যায়। তারা অবস্থানের কাছে পৌঁছালে লুকিয়ে থাকা বিমানসেনা তার সিএসইএল মোড পরিবর্তন করেন। ফলে সহযোদ্ধারা সঠিক অবস্থান দ্রুত খুঁজে পেতে সক্ষম হন। ভোররাত প্রায় ৪টার দিকে, দেহদাশত শহরের আশপাশের আকাশে বিস্ফোরণের আলো দেখা যায়। জায়গাটির অবস্থান পর্বতমালার ঠিক অন্য পাশে। 

কাছাকাছি সময়ে ধারণ করা বিভিন্ন ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, আশপাশের রাস্তায় যানবাহনগুলো অবরুদ্ধ হয়ে আছে। কয়েকটি সূত্রের দাবি, ওই অঞ্চলের সরকারবিরোধী বাসিন্দারা ঘটনার সময় ইরানি সেনাদের পাহাড়ে পৌঁছাতে বাধা দিয়েছিলেন। 

বিপুল সমরশক্তি সমাবেশের পরেও যুক্তরাষ্ট্রের এই উদ্ধার অভিযান পুরোপুরি পরিকল্পনামাফিক শেষ হয়নি। ভোর হওয়ার কিছু পরে বিমান সেনার লুকানোর জায়গার কাছে গোলাগুলির কিছু ঘটনার কথা শোনা যাচ্ছে। অসমর্থিত স্থানীয় সূত্রের দাবি, এতে তিনজন ইরানি বিপ্লবী গার্ড নিহত হন। 

পর্বতের ঠিক নিচে মাহিয়ার শহরের অন্য পাশে একটি পরিত্যক্ত বিমানবন্দর যুক্তরাষ্ট্রের কমান্ডোদের জন্য দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়। ইসফাহান শহর থেকে প্রায় ৩০ মাইল দক্ষিণ-পূর্বের এই এয়ারফিল্ডটিকে রাতারাতি অস্থায়ী সামরিক ঘাঁটিতে পরিণত করা হয়েছিল। কমান্ডোদের লজিস্টিকস সহায়তা এবং নিখোঁজ বিমান সেনাকে খুঁজে পাওয়ার পর সেনাদের সরিয়ে আনার কাজে এটি ব্যবহার করা হয়। 

তবে দুর্ভাগ্যবশত সেখানে অবতরণের পর দুটি পরিবহন বিমান নরম মাটিতে আটকে যায়। বিশাল এসব সি-১৩০ হারকিউলিস বিমানের প্রতিটির দাম প্রায় ১০০ মিলিয়ন পাউন্ড। এগুলো কার্যত অচল হয়ে পড়ায় সংশ্লিষ্ট সেনাদের সরিয়ে নিতে আরও তিনটি বিমান তড়িঘড়ি করে পাঠাতে হয়েছিল।

নতুন বিমানগুলো পৌঁছাতে কয়েক ঘণ্টা সময় লাগে। এ সময় উদ্ধারকারী দল এবং বিমান সেনাকে ঘিরে তৈরি হয় উদ্বেগ। তারা অপেক্ষা করছিলেন ওই এয়ারফিল্ডে। 

শেষপর্যন্ত নতুন তিনটি বিমান সবাইকে নিরাপদে ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হয়। এয়ারস্ট্রিপ ছেড়ে আসার আগে অচল দুটি পরিবহন বিমান বিস্ফোরকের সাহায্যে ধ্বংস করেন কমান্ডোরা। ইঞ্জিন বিকল হয়ে পড়ে একটি হেলিকপ্টারও ধ্বংস করা হয়। শত্রুপক্ষের হাতে পড়া ঠেকাতেই নেয়া হয় এমন সিদ্ধান্ত। এভাবেই শেষ হয় প্রায় দেড় দিনের দুর্ধর্ষ এক সামরিক উদ্ধার অভিযান। 


ad728

আলোচিত শীর্ষ ১০ সংবাদ