পাবনায় ইলিশ সংরক্ষন অভিযানে দুর্নীতি, হিসাব মিলছে না জব্দ ইলিশের
নিজস্ব প্রতিবেদক
- প্রকাশিত : ১৮ নভেম্বর, ২০২৫ খ্রিস্টাব্দ
পাবনা সংবাদদাতা :
সরকার ঘোষিত নিষেধাজ্ঞা চলাকালে পাবনায় ইলিশ সংরক্ষণ অভিযান নিয়ে দেখা দিয়েছে অনিহা, অসঙ্গতি ও অস্বচ্ছতা। পদ্মা নদীতে রাতে অবাধে চলছে মাছ শিকার, আর প্রশাসনের তথ্যে মিলছে না জব্দ ইলিশের পরিমাণ। কেউ বলছেন ৫ কেজি, কেউ বলছেন ২৫ কেজি। জেলা অফিসে জব্দকৃত মাছের হদিস নেই পুরোপুরি।
৪ অক্টোবর থেকে ২৫ অক্টোবর পর্যন্ত মা ইলিশ রক্ষায় সারাদেশে ইলিশ ধরা, বিক্রি ও পরিবহন নিষিদ্ধ করেছে সরকার। কিন্তু মাঠপর্যায়ে এই অভিযানে দেখা যাচ্ছে ভিন্নচিত্র।
পাবনা সদর উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ আব্দুল হালিম জানান, আমরা ২৩টি অভিযান পরিচালনা করেছি। এতে ৫ কেজি ইলিশ ও ৩২ হাজার মিটার জাল জব্দ হয়েছে। অন্যদিকে জেলা মৎস্য কর্মকর্তা দীপক কুমার পাল বলেন, পুরো জেলায় ২৬টি অভিযান চালানো হয়েছে। সেখানে ২৫কেজি ইলিশ ও ৮১হাজার মিটার জাল জব্দ করা হয়েছে। একই জেলার দুই দপ্তরের তথ্যের এই অমিল এখন প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ সমন্বয় ও স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, নিষেধাজ্ঞা চললেও রাতে পদ্মায় অবাধে ইলিশ শিকার হচ্ছে এবং আশেপাশের বাড়িতেই বিক্রি হচ্ছে দেদারসে। অনেকে বলছেন, প্রশাসনের কিছু কর্মকর্তা ও প্রভাবশালী মহলের মধ্যে ভাগাভাগির সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে।
একজন স্থানীয় ব্যবসায়ী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, অভিযান হওয়ার আগে কারা নদীতে নামবে, কে নামবে না,সব ঠিক হয়ে যায়। ভাগ ঠিক থাকলে অভিযান বন্ধ থাকে।”
আগে জব্দকৃত মাছ এতিমখানা বা মাদ্রাসায় বিতরণ করা হতো। এবার এমন কোনো বিতরণের খবর নেই। ফলে প্রশ্ন উঠেছে জব্দকৃত ২৫কেজি ইলিশের ২০কেজি কোথায় গেল?
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (এসিল্যান্ড) জানিয়েছেন, আমি মাত্র একটি অভিযানে উপস্থিত ছিলাম। পাঁচটি অভিযানের তথ্য জানি, বাকি বিষয়ে কিছু জানানো হয়নি।
অন্যদিকে উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা জানান, অফিসে তিনজন কর্মকর্তা রয়েছেন। এর মধ্যে দুইজন অন্য জেলায় পাঠানো হয়েছে। ফলে অভিযান সীমিত হয়েছে। স্থানীয়দের প্রশ্ন পদ্মার তীরে যখন মা ইলিশ রক্ষার সময় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, তখন কীভাবে কর্মকর্তাদের অন্যত্র পাঠানো হলো? কেউ কেউ একে ইচ্ছাকৃতভাবে অভিযান দুর্বল করার কৌশল বলছেন।
একজন স্থানীয় ব্যবসায়ী (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক) বলেন সংশ্লিষ্ট সকল অফিস এর সাথে জড়িত। কেউ নেয় টাকা আর কেউ মাছ।
পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. আরিফুল হক বলেন, “মাঠপর্যায়ের দায়সারা মনোভাব ও তথ্যের অসঙ্গতি সরকারের উদ্যোগকে ব্যর্থ করছে। ইলিশ সংরক্ষণে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা এখন জরুরী।
বাংলাদেশের জাতীয় মাছ ইলিশ রক্ষায় সরকারের উদ্যোগ মাঠপর্যায়ে দুর্বল তদারকি ও গোপন সমঝোতায় ভেস্তে যাচ্ছে। সরকারি তথ্যই যখন প্রশ্নবিদ্ধ হয়, তখন প্রকৃত পরিস্থিতি বোঝা আরও কঠিন হয়ে পড়ে।
সচেতন মহল বলছেন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি ছাড়া ইলিশ রক্ষা অভিযান কেবল কাগজে থাকবে, নদীতে নয়।
আপনার মতামত লিখুন :