রোয়াংছড়িতে উন্নয়ন প্রকল্পের নামে লুটপাট, পিআইও’র বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ
নিজস্ব প্রতিবেদক
- প্রকাশিত : ১২ জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
চিংনুমং মারমা, রোয়াংছড়ি প্রতিনিধি :
বান্দরবানের রোয়াংছড়ি উপজেলায় টেস্ট রিলিফ (টিআর), কাজের বিনিময়ে খাদ্য (কাবিখা) ও কাবিটা প্রকল্পে ভয়াবহ অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) মিলটন দস্তিদার–এর বিরুদ্ধে উন্নয়ন কাজ না করেই সরকারি অর্থ ও খাদ্যশস্য আত্মসাতের গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও বাসিন্দারা।
অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২৪–২০২৫ ও ২০২৫–২০২৬ অর্থবছরে দুর্যোগ ও ত্রাণ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ের আওতায় গ্রামীণ অবকাঠামো সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণ প্রকল্পে বরাদ্দ পাওয়া অর্থে বাস্তবে কোনো কাজ না করেই বিল উত্তোলন করা হয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, উপজেলার ২ নম্বর তারাছা ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডে কাবিটা (নগদ অর্থ) প্রকল্পের আওতায় ‘লেগ্রীব্রাং থেকে কমদমপ্রু পাড়া পর্যন্ত রাস্তা মাটি দ্বারা পুনঃনির্মাণ’ শীর্ষক প্রকল্পে দুই লাখ টাকা বরাদ্দ দেখানো হয়। একই ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডে আরও একটি প্রকল্পে বরাদ্দ দেওয়া হলেও সরেজমিনে কাজের কোনো বাস্তব চিত্র পাওয়া যায়নি।
দ্বিতীয় ধাপে ৫ নম্বর ওয়ার্ডে ‘অংতং পাড়া থেকে ছাংকিং পাড়া পর্যন্ত রাস্তা মাটি দ্বারা পুনঃসংস্কার’ প্রকল্পে ৫.৩০০ মেট্রিক টন খাদ্যশস্য বরাদ্দ দেখানো হয়। স্থানীয়দের দাবি, প্রায় দেড় থেকে দুই কিলোমিটার দীর্ঘ এই সড়কটি অনেক আগেই এলাকাবাসী নিজেদের অর্থায়নে সংস্কার করেছিলেন। অথচ সেই পুরোনো রাস্তার নামেই নতুন প্রকল্প দেখিয়ে পুরো অর্থ ও খাদ্যশস্য আত্মসাৎ করা হয়েছে। মাঠপর্যায়ে পরিদর্শনে নতুন কোনো কাজের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ইউপি সদস্য অভিযোগ করে বলেন, প্রতিটি বিল উত্তোলনের আগে পিআইও-কে ১৬ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন দিতে বাধ্য করা হয়। কমিশন না দিলে বিল আটকে রেখে চরম হয়রানি করা হয়। অনেক ক্ষেত্রে ইউপি সদস্যদের নামমাত্র সভাপতি বানিয়ে প্রকল্প দেখানো হলেও মূল অর্থ পিআইও নিজেই নিয়ে নেন বলে অভিযোগ করেন তিনি।
স্থানীয়দের ভাষ্য, ২০২৫ সালের ৫ জানুয়ারি অতিরিক্ত দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই মিলটন দস্তিদার একটি সিন্ডিকেট গড়ে তুলে এই অনিয়ম চালিয়ে যাচ্ছেন। চেয়ারম্যান ও ইউপি সদস্যদের চাপের মুখে রেখে কমিশন আদায়ের পর তবেই বিল ছাড় করা হয়। চলমান দুই অর্থবছরের টিআর বরাদ্দের বড় অংশ শুরুতেই আত্মসাৎ করা হয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে।
৫ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য ও প্রকল্প সভাপতি মংক্যথোয়াই মারমা অনিয়মের বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, রাস্তার কাজের জন্য প্রায় তিন লাখ টাকা সমমূল্যের চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। আংশিক কাজ করার পর নির্ধারিত পার্সেন্টেজ রেখে বাকি অর্থ পিআইও-কে ফেরত দিতে হয়েছে।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে পিআইও মিলটন দস্তিদার বলেন, তাঁর দপ্তরের সব কাজ নিয়ম মেনেই সম্পন্ন হয়েছে এবং কোনো অনিয়ম হয়নি। অর্থ ফেরত নেওয়ার অভিযোগও তিনি অস্বীকার করেন।
এ বিষয়ে তাজমিন আলম তুলি, রোয়াংছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও), জানান— প্রকল্প বাস্তবায়নে অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেলে তদন্তের মাধ্যমে দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
স্থানীয়দের দাবি, দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্ত করে এই দুর্নীতির সঙ্গে জড়িতদের জবাবদিহির আওতায় আনা না হলে উন্নয়ন প্রকল্পে জনআস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়বে।
আপনার মতামত লিখুন :