বিলুপ্তির পথে ‘মাকাল’ ফল, হারিয়ে যাচ্ছে প্রকৃতির এক মূল্যবান ভেষজ সম্পদ
নিজস্ব প্রতিবেদক
- প্রকাশিত : ২২ জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
মো: মানসুরুল হক রবিন, হোসেনপুর (কিশোরগঞ্জ) প্রতিনিধি :
একসময় বাংলার গ্রামাঞ্চলের বন-জঙ্গল ও পরিত্যক্ত জমিতে সহজেই দেখা মিলত লাল টকটকে মাকাল ফলের। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘মাকাল’ কবিতার মাধ্যমে পরিচিত এই ফল আজ বাস্তবে নতুন প্রজন্মের কাছে প্রায় অচেনা। পরিবেশ বিপর্যয়, বন উজাড় এবং রাসায়নিক কীটনাশকের ব্যাপক ব্যবহারের কারণে ঔষধি গুণে ভরপুর এই দেশীয় উদ্ভিদ এখন বিলুপ্তির ঝুঁকিতে।
উদ্ভিদবিদদের মতে, মাকালের বৈজ্ঞানিক নাম ট্রাইকোস্যান্থেস ট্রাইকাসপিড্যাটা। এটি একটি বহুবর্ষজীবী লতাজাতীয় উদ্ভিদ, যা বড় বড় গাছকে আশ্রয় করে ৩০ থেকে ৪০ ফুট পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে। বর্ষাকালে সাদা ফুল ফোটে এবং ফল কাঁচা অবস্থায় সবুজ, পরে হলুদ ও পাকলে উজ্জ্বল লাল রঙ ধারণ করে। দেখতে অনেকটা আপেলের মতো হলেও ভেতরের অংশ কালো ও তিতা। কিশোরগঞ্জ অঞ্চলে এটি ‘কাওয়াকাডি’ নামেও পরিচিত।
স্থানীয়দের মতে, মাকাল শুধু একটি বুনো ফল নয়, বরং একটি গুরুত্বপূর্ণ ভেষজ উদ্ভিদ। এর শিকড়, কাণ্ড, পাতা, ফল ও বীজ বিভিন্ন রোগের প্রাচীন চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়ে আসছে। কোষ্ঠকাঠিন্য, বদহজম, কাশি, শ্বাসকষ্ট, জন্ডিস, বাত-ব্যথা, প্রস্রাবের সমস্যা, স্তনের প্রদাহ এবং শিশুদের হাঁপানিসহ নানা রোগের চিকিৎসায় এর ব্যবহার রয়েছে বলে জানা যায়।
এ ছাড়া মাকালের বীজের তেল সাপ ও বিছার কামড়, আমাশয়, ডায়রিয়া এবং মৃগীরোগের লোকজ চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়। বীজ ও আঁশ শুকিয়ে তৈরি করা প্রাকৃতিক বিষ কৃষিজমির পোকামাকড় ও ইঁদুর দমনে কার্যকর ভূমিকা রাখে। কিশোরগঞ্জের হোসেনপুরসহ বিভিন্ন এলাকার কৃষকরা একসময় এই প্রাকৃতিক বিষ ব্যবহার করে ফসল রক্ষা করতেন।
তবে বর্তমানে পরিস্থিতি বদলে গেছে। বনভূমি ধ্বংস, আবাসস্থল সংকুচিত হওয়া এবং রাসায়নিক কীটনাশকের সহজলভ্যতার কারণে মাকাল গাছ দ্রুত হারিয়ে যাচ্ছে। এক যুগ আগেও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে যে পরিমাণ মাকাল গাছ দেখা যেত, বর্তমানে তা প্রায় দশ ভাগের এক ভাগে নেমে এসেছে বলে স্থানীয়দের দাবি।
স্থানীয় পরিবেশবিদ অধ্যাপক এবিএম ছিদ্দিক চঞ্চল বলেন, প্রাকৃতিক বন ধ্বংস এবং পরিবেশবান্ধব দেশীয় উপকরণের প্রতি আগ্রহ কমে যাওয়ায় মাকাল বিলুপ্তির পথে। তিনি মনে করেন, এখনই সংরক্ষণ উদ্যোগ না নেওয়া হলে আগামী এক দশকের মধ্যেই দেশের প্রকৃতি থেকে এই মূল্যবান ভেষজ উদ্ভিদ সম্পূর্ণ হারিয়ে যেতে পারে।
পরিবেশবিদরা মাকাল সংরক্ষণে সরকারি উদ্যোগ, গবেষণা এবং সচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি দেশীয় ভেষজ উদ্ভিদের পুনরুদ্ধারে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
আপনার মতামত লিখুন :