আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মনোবল ফিরছে, জনগণের আস্থা অর্জনই এখন বড় চ্যালেঞ্জ : খায়রুল অলম সুমন


FavIcon
নিজস্ব প্রতিবেদক
  • প্রকাশিত : ৩১ অক্টোবর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

ছবির ক্যাপশন:

খায়রুল অলম সুমন :

একটি রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা, নাগরিকের নিরাপত্তা এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেশের মানুষ যখন নিরাপদে ঘর থেকে বের হতে পারেন, নির্বিঘ্নে কর্মস্থলে যেতে পারেন, ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচালনা করতে পারেন এবং বিপদের সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছ থেকে সহযোগিতা পান, তখনই রাষ্ট্রের নিরাপত্তাব্যবস্থার কার্যকারিতা দৃশ্যমান হয়। আর এই নিরাপত্তাব্যবস্থার অন্যতম প্রধান ভিত্তি হলো বাহিনীর সদস্যদের মনোবল, পেশাদারত্ব এবং জনগণের আস্থা।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বাংলাদেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং পুলিশ বাহিনীর কার্যক্রম বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে। বিভিন্ন স্থানে থানায় হামলা, অগ্নিসংযোগ, অস্ত্র লুট এবং পুলিশের বিরুদ্ধে জনরোষের ঘটনা বাহিনীর স্বাভাবিক কার্যক্রমকে ব্যাহত করে। একই সঙ্গে অতীতের কিছু কর্মকাণ্ড নিয়ে জনমনে ক্ষোভ, অবিশ্বাস ও প্রশ্ন তৈরি হয়। ফলে বাহিনীর একটি অংশের মনোবল ও স্বাভাবিক কর্মপরিবেশে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।

সেই পরিস্থিতি থেকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে পুনরায় কার্যকর অবস্থানে ফিরিয়ে আনা সহজ কাজ ছিল না। কারণ, একটি বাহিনীর অবকাঠামো পুনর্গঠন করা সম্ভব হলেও মানুষের মনে তৈরি হওয়া অবিশ্বাস দূর করতে সময়, আন্তরিকতা এবং ধারাবাহিক ইতিবাচক কর্মকাণ্ড প্রয়োজন।

মনোবল পুনরুদ্ধার রাষ্ট্রের স্বার্থেই জরুরি

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরাও এই সমাজেরই অংশ। তাঁদের দায়িত্ব পালন করতে হয় নানা প্রতিকূলতা, ঝুঁকি ও অনিশ্চয়তার মধ্যে। অপরাধ দমন, অপরাধী শনাক্তকরণ, জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা, সহিংসতা প্রতিরোধ এবং দুর্যোগকালীন পরিস্থিতি মোকাবিলায় তাঁদের সক্রিয় ভূমিকা প্রয়োজন। দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ভীতি, অনিশ্চয়তা কিংবা সিদ্ধান্তহীনতা তৈরি হলে তার প্রভাব সাধারণ মানুষের নিরাপত্তার ওপরও পড়তে পারে।

তবে মনোবল পুনরুদ্ধারের অর্থ এই নয় যে, বাহিনীর সদস্যরা আইনবহির্ভূত কাজ করার অবাধ সুযোগ পাবেন। বরং এর অর্থ হলো, তাঁরা যেন আইন অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করতে পারেন, অন্যায় চাপের কাছে নতি স্বীকার করতে বাধ্য না হন এবং সৎভাবে দায়িত্ব পালন করার কারণে অযৌক্তিক হয়রানির শিকার না হন।

একইভাবে, দায়িত্বের অপব্যবহার, দুর্নীতি, ক্ষমতার অপপ্রয়োগ কিংবা মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠলে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে যথাযথ ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। অপরাধের দায় ব্যক্তির, আবার কোনো প্রতিষ্ঠানের কাঠামোগত দুর্বলতা থাকলে তা সংশোধনের দায়িত্বও রাষ্ট্রের।

অর্থাৎ, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের নিরাপদ ও পেশাদার কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা এবং তাঁদের জবাবদিহির আওতায় রাখা—দুটি বিষয় পরস্পরের বিরোধী নয়। বরং একটি কার্যকর ও জনবান্ধব বাহিনী গড়ে তুলতে উভয়ই অপরিহার্য।

পরিবর্তন দৃশ্যমান করতে হবে মাঠপর্যায়ে

৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়ের চ্যালেঞ্জ কাটিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়ানোর যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে, তাকে স্থায়ী অগ্রগতিতে রূপ দিতে হবে। শুধু বাহিনীর অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা পুনরুদ্ধার কিংবা সদস্যদের আত্মবিশ্বাস বাড়ানোই যথেষ্ট নয়; সাধারণ মানুষ যেন প্রতিদিনের অভিজ্ঞতায় পরিবর্তন অনুভব করেন, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।

একজন নাগরিক থানায় গিয়ে কী ধরনের সেবা পাচ্ছেন, তাঁর অভিযোগ কতটা গুরুত্ব দিয়ে শোনা হচ্ছে, বিপদের সময় পুলিশ কত দ্রুত সাড়া দিচ্ছে এবং তদন্ত কতটা নিরপেক্ষভাবে পরিচালিত হচ্ছে—এসব বিষয়ই বাহিনীর কার্যকারিতা মূল্যায়নের গুরুত্বপূর্ণ মাপকাঠি।

কোনো অসহায় মানুষ থানায় গিয়ে যদি প্রভাবশালী ব্যক্তির পরিচয় দিতে বাধ্য হন, কোনো ভুক্তভোগী যদি মামলা গ্রহণে অনীহা বা অযাচিত হয়রানির শিকার হন, কিংবা কোনো নিরপরাধ ব্যক্তি যদি ক্ষমতার অপব্যবহারের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হন, তাহলে শুধু বাহিনীর সক্ষমতা দিয়ে জনগণের আস্থা অর্জন সম্ভব নয়।

অন্যদিকে, একজন সাধারণ নাগরিকের অভিযোগ গুরুত্ব দিয়ে শোনা, আইনগত সহায়তা দেওয়া, অপরাধের শিকার ব্যক্তির পাশে দাঁড়ানো এবং অপরাধী যত প্রভাবশালীই হোক, আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার মধ্য দিয়ে জনআস্থা শক্তিশালী হয়।

পুলিশের সাফল্য তাই শুধু কতজনকে গ্রেপ্তার করা হলো, তার হিসাব দিয়ে নির্ধারণ করা উচিত নয়। অপরাধ কমেছে কি না, তদন্তের মান কেমন, মামলার নিষ্পত্তিতে অগ্রগতি হয়েছে কি না এবং মানুষ পুলিশের সেবায় সন্তুষ্ট কি না- এসব সূচকও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ও নিরপেক্ষ বাহিনী চাই

বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হলো রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত থেকে দায়িত্ব পালন নিশ্চিত করা। রাষ্ট্রের সরকার পরিবর্তিত হতে পারে, রাজনৈতিক নেতৃত্ব পরিবর্তিত হতে পারে, কিন্তু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দায়িত্ব হওয়া উচিত সংবিধান ও প্রচলিত আইন অনুযায়ী সব নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।

কোনো ব্যক্তি রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী, বিরোধী মতের অনুসারী কিংবা সাধারণ নাগরিক—শুধু পরিচয়ের কারণে তাঁর প্রতি আইন প্রয়োগে বৈষম্য করা যাবে না। অপরাধের অভিযোগের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক পরিচয় নয়, প্রমাণ ও আইনই হবে সিদ্ধান্তের ভিত্তি।

একইভাবে, রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে কেউ যেন মামলা, গ্রেপ্তার কিংবা তদন্তকে ব্যক্তিগত প্রতিশোধের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে না পারেন, সে বিষয়ে কার্যকর নজরদারি প্রয়োজন।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হলে একদিকে যেমন প্রতিষ্ঠানের পেশাদারত্ব ক্ষতিগ্রস্ত হয়, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের মধ্যে বৈষম্যের ধারণা তৈরি হয়। দীর্ঘ মেয়াদে এর প্রভাব পড়ে রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর মানুষের আস্থায়।

সুতরাং, নিয়োগ, পদায়ন, পদোন্নতি ও বদলির ক্ষেত্রে যোগ্যতা, সততা এবং পেশাগত দক্ষতাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। দায়িত্ব পালনে অযাচিত রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বন্ধ করতে হবে। একই সঙ্গে বাহিনীর সদস্যদেরও নিশ্চিত করতে হবে, তাঁরা কোনো রাজনৈতিক পক্ষের প্রতিনিধি নন; তাঁরা আইন প্রয়োগকারী রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের সদস্য।

জবাবদিহি ছাড়া আস্থা ফিরবে না

জনগণের আস্থা অর্জনের প্রশ্নে জবাবদিহি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি। অতীতের কোনো ঘটনার সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ জড়িত থাকলে সেগুলো উপেক্ষা করা যেমন গ্রহণযোগ্য নয়, তেমনি প্রমাণ ও যথাযথ প্রক্রিয়া ছাড়া কাউকে অপরাধী হিসেবে বিবেচনা করাও ন্যায়বিচারের পরিপন্থী।

অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত, সাক্ষ্যপ্রমাণের যথাযথ মূল্যায়ন এবং আইনি প্রক্রিয়ায় দায় নির্ধারণ করতে হবে। অপরাধ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। প্রয়োজনে নির্দেশদাতা, পরিকল্পনাকারী কিংবা দায়িত্ব পালনে গুরুতর অবহেলার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের ভূমিকাও তদন্তের আওতায় আসতে হবে।

এতে বাহিনীর মনোবল দুর্বল হওয়ার কথা নয়; বরং সৎ ও দায়িত্বশীল সদস্যদের প্রতি মানুষের আস্থা বাড়ার সুযোগ তৈরি হয়। কারণ, যখন মানুষ দেখতে পায় যে অপরাধের ক্ষেত্রে পদমর্যাদা বা প্রভাব বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে না, তখন ন্যায়বিচারের প্রতি তাদের বিশ্বাস শক্তিশালী হয়।

এ ক্ষেত্রে অভিযোগ গ্রহণ, তদন্তের অগ্রগতি এবং বিভাগীয় ব্যবস্থা সম্পর্কে স্বচ্ছতা বাড়ানো প্রয়োজন। একই সঙ্গে অভিযোগকারী ও সাক্ষীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে তাঁরা ভয়ভীতি ছাড়াই অভিযোগ জানাতে পারেন।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধেও মিথ্যা অভিযোগ উঠতে পারে। তাই তাঁদের ন্যায্য আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ এবং অভিযোগের দ্রুত, নিরপেক্ষ নিষ্পত্তি নিশ্চিত করাও জরুরি। জবাবদিহি যেন প্রতিহিংসার হাতিয়ার না হয়, আবার পেশাগত পরিচয় যেন দায়মুক্তির ঢাল হয়ে না দাঁড়ায়।

জনবান্ধব পুলিশিং ও জনগণের অংশগ্রহণ

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নে শুধু বাহিনীর সদস্যসংখ্যা, যানবাহন কিংবা প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ালেই চলবে না। প্রয়োজন জনগণের সঙ্গে কার্যকর সম্পর্ক গড়ে তোলা।

পুলিশ ও জনগণের মধ্যে দূরত্ব কমাতে নিয়মিত মতবিনিময় সভা, কমিউনিটি পুলিশিং, স্থানীয় পর্যায়ে নাগরিক নিরাপত্তা কমিটি এবং জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম জোরদার করা যেতে পারে। এসব উদ্যোগের মাধ্যমে এলাকার অপরাধপ্রবণতা, মাদক, কিশোর অপরাধ, চুরি-ছিনতাই, নারী ও শিশুর নিরাপত্তা এবং সামাজিক বিরোধের মতো বিষয়গুলো সম্পর্কে আগাম ধারণা পাওয়া সম্ভব।

স্থানীয় বাসিন্দা, জনপ্রতিনিধি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি, ব্যবসায়ী, সামাজিক সংগঠন এবং নাগরিক সমাজের সদস্যদের সঙ্গে পুলিশের নিয়মিত যোগাযোগ থাকলে অনেক সমস্যার সমাধান সংঘাতের পর্যায়ে পৌঁছানোর আগেই করা সম্ভব।

তবে নাগরিক নিরাপত্তা কমিটি কিংবা কমিউনিটি পুলিশিং যেন কোনো রাজনৈতিক গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে না যায়, সে বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে। এসব উদ্যোগের মূল লক্ষ্য হবে অপরাধ প্রতিরোধ, জনসচেতনতা এবং আইনসম্মত সহযোগিতা; কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর হাতে আইন তুলে দেওয়া নয়।

একই সঙ্গে থানাগুলোকে আরও সেবাবান্ধব করতে হবে। নারী, শিশু, প্রবীণ ব্যক্তি, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি এবং সহিংসতার শিকার মানুষের জন্য সহজে অভিযোগ জানানোর পরিবেশ তৈরি করতে হবে। থানায় সেবাপ্রার্থীদের সঙ্গে সম্মানজনক আচরণ নিশ্চিত করতে হবে।

একজন নাগরিক যখন অনুভব করবেন যে পুলিশ তাঁর কথা শুনছে, তাঁর অধিকারকে সম্মান করছে এবং ন্যায়সংগত সহায়তা দিচ্ছে, তখনই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক বদলাতে শুরু করবে।

প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তি ও কর্মপরিবেশে বিনিয়োগ প্রয়োজন

বর্তমান সময়ের অপরাধের ধরন বদলেছে। সাইবার অপরাধ, অনলাইন প্রতারণা, সংঘবদ্ধ অপরাধ, আর্থিক জালিয়াতি এবং প্রযুক্তিনির্ভর অপরাধ মোকাবিলায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দক্ষতা বাড়ানো প্রয়োজন। এ জন্য আধুনিক প্রশিক্ষণ, অপরাধ বিশ্লেষণ, ডিজিটাল তদন্ত এবং তথ্যপ্রযুক্তির যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।

একই সঙ্গে ভিড় নিয়ন্ত্রণ, বিক্ষোভ মোকাবিলা, গ্রেপ্তার, জিজ্ঞাসাবাদ এবং বলপ্রয়োগের ক্ষেত্রে সুস্পষ্ট আইনগত নির্দেশনা ও মানবাধিকারভিত্তিক প্রশিক্ষণ প্রয়োজন। বলপ্রয়োগের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয়তা, আনুপাতিকতা ও আইনগত সীমা কঠোরভাবে অনুসরণ করতে হবে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের নামে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ যেন প্রাণহানি কিংবা গুরুতর ক্ষতির কারণ না হয়, তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।

বাহিনীর সদস্যদের কর্মঘণ্টা, আবাসন, চিকিৎসা, মানসিক স্বাস্থ্য, পর্যাপ্ত বিশ্রাম এবং ঝুঁকিপূর্ণ দায়িত্বের উপযুক্ত সহায়তার বিষয়গুলোও গুরুত্ব পেতে হবে। দীর্ঘ সময় চাপের মধ্যে কাজ করা সদস্যদের জন্য প্রয়োজনীয় সহায়তা না থাকলে তার প্রভাব দায়িত্ব পালনের মানে পড়তে পারে।

তবে প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তির সুফল পেতে হলে সেগুলোর ব্যবহার, তদারকি এবং মূল্যায়নের ব্যবস্থাও থাকতে হবে। শুধু নতুন সরঞ্জাম সংগ্রহ নয়, সেগুলো দক্ষতা ও জনসেবার মান কতটা বাড়াচ্ছে, সেটিও নিয়মিত পর্যালোচনা করতে হবে।

সংস্কার বাস্তবায়নই হবে অগ্রগতির প্রকৃত পরীক্ষা

বাংলাদেশে পুলিশ সংস্কার নিয়ে বিভিন্ন সময়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা ও সুপারিশ সামনে এসেছে। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে পুলিশ সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদন জমা দেওয়ার পর নিরপেক্ষতা, জবাবদিহি, মানবাধিকার, বলপ্রয়োগের নীতিমালা, গ্রেপ্তার ও জিজ্ঞাসাবাদের পদ্ধতি এবং জনবান্ধব পুলিশিংয়ের মতো বিষয়গুলো নতুন করে গুরুত্ব পায়।

কিন্তু সংস্কার কমিশন গঠন কিংবা প্রতিবেদন প্রকাশের মধ্যেই কাজ শেষ হয়ে যায় না। সুপারিশগুলোর বাস্তবায়ন, প্রয়োজনীয় আইনগত পরিবর্তন, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং কার্যকর তদারকির ব্যবস্থা গড়ে তোলাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

এ ক্ষেত্রে একটি স্বাধীন ও বিশ্বাসযোগ্য অভিযোগ পর্যালোচনা ব্যবস্থা, তদন্তে স্বচ্ছতা, নিয়মিত কর্মদক্ষতা মূল্যায়ন এবং জনগণের মতামত গ্রহণের ব্যবস্থা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নের অগ্রগতি সম্পর্কে নিয়মিত তথ্য প্রকাশ করা হলে জনগণও বুঝতে পারবেন, সংস্কারের প্রতিশ্রুতি কতটা বাস্তবে রূপ নিচ্ছে।

সংস্কারের লক্ষ্য কোনো প্রতিষ্ঠানকে দুর্বল করা নয়; বরং প্রতিষ্ঠানটিকে আরও দক্ষ, নিরপেক্ষ, দায়িত্বশীল ও জনবান্ধব করে তোলা। একটি শক্তিশালী আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মানে এমন বাহিনী নয়, যার ক্ষমতার কোনো সীমা নেই। বরং প্রকৃত শক্তি হলো এমন একটি প্রতিষ্ঠান, যা আইন মেনে দৃঢ়ভাবে দায়িত্ব পালন করে এবং নিজের কাজের জন্য জবাবদিহি করতে প্রস্তুত থাকে।

সামনে আরও ভালো হওয়ার সুযোগ রয়েছে

৫ আগস্ট-পরবর্তী সংকট থেকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে পুনর্গঠন এবং স্বাভাবিক কার্যক্রমে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। বাহিনীর মনোবল পুনরুদ্ধার, শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা এবং কার্যকর সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি জনগণের আস্থা পুনর্গঠনকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে।

এ ক্ষেত্রে আশাবাদী হওয়ার কারণ রয়েছে, তবে সেই আশাবাদকে বাস্তব ফলাফলে রূপান্তর করা জরুরি। অপরাধ দমন, দ্রুত সাড়া প্রদান, নিরপেক্ষ তদন্ত, নাগরিকের সঙ্গে সম্মানজনক আচরণ এবং অভিযোগের যথাযথ নিষ্পত্তির মাধ্যমে উন্নতির প্রমাণ দিতে হবে।

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নত হয়েছে কি না, তা নিয়ে বিভিন্ন পক্ষের মূল্যায়নে পার্থক্য থাকতে পারে। তাই কেবল বক্তব্য কিংবা বিচ্ছিন্ন ঘটনার ভিত্তিতে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর পরিবর্তে অপরাধের পরিসংখ্যান, জননিরাপত্তার বাস্তব চিত্র, সেবার মান এবং নাগরিকদের অভিজ্ঞতা বিবেচনা করা প্রয়োজন।

ভবিষ্যতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী আরও ভালো করবে- এমন প্রত্যাশা অবশ্যই থাকতে পারে। কিন্তু এই প্রত্যাশা পূরণ করতে হলে ধারাবাহিক পেশাদারত্ব, রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা, জবাবদিহি এবং জনসেবার মান উন্নয়নের বিকল্প নেই।

রাষ্ট্রকে যেমন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের নিরাপদ কর্মপরিবেশ, প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করতে হবে, তেমনি বাহিনীকেও প্রমাণ করতে হবে যে জনগণের অধিকার রক্ষা এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠাই তাদের প্রধান দায়িত্ব।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনী রাষ্ট্রের নিরাপত্তাব্যবস্থার একটি অপরিহার্য স্তম্ভ। এই স্তম্ভকে শক্তিশালী করতে হলে একদিকে সদস্যদের মনোবল ও পেশাগত সক্ষমতা বাড়াতে হবে, অন্যদিকে ক্ষমতার অপব্যবহার রোধ এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। একটির বিনিময়ে অন্যটিকে বিসর্জন দেওয়া যাবে না।

মনে রাখতে হবে, জনগণের আস্থা কোনো আদেশ দিয়ে অর্জন করা যায় না,  তা অর্জন করতে হয় কাজের মাধ্যমে। একজন বিপদগ্রস্ত মানুষ যখন পুলিশের কাছে গিয়ে সহায়তা পান, একজন নিরপরাধ নাগরিক যখন হয়রানি থেকে সুরক্ষা পান, একজন অপরাধের শিকার ব্যক্তি যখন ন্যায়বিচারের পথে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ পান এবং একজন অপরাধী যখন পরিচয়-প্রভাব নির্বিশেষে আইনের মুখোমুখি হন- তখনই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতি মানুষের বিশ্বাস দৃঢ় হয়।

আগামী দিনে বাংলাদেশে এমন একটি আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা গড়ে উঠুক, যেখানে বাহিনীর সদস্যরা আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে আইনসম্মত দায়িত্ব পালন করবেন, সাধারণ মানুষ নির্ভয়ে তাঁদের কাছে যাবেন এবং রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিক সমান আইনি সুরক্ষা পাবেন- এটাই সময়ের দাবি।

কারণ, একটি শক্তিশালী রাষ্ট্রের পরিচয় শুধু তার আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সক্ষমতায় নয়, সেই বাহিনীর প্রতি জনগণের বিশ্বাস, শ্রদ্ধা এবং নির্ভরতার মধ্যেও নিহিত। অতএব, পেশাদারত্ব, নিরপেক্ষতা ও জবাবদিহির মধ্য দিয়েই গড়ে উঠতে পারে জনবান্ধব আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা।


ad728

আলোচিত শীর্ষ ১০ সংবাদ