তেলের দাম বাড়ার পেছনে কয়েকটি বড় কারণ, বিশ্ববাজারের উত্তাপে বাংলাদেশেও চাপ
নিজস্ব প্রতিবেদক
- প্রকাশিত : ০৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
নিজস্ব প্রতিবেদক :
বিশ্ববাজারে আবারও ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ও তেল সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা, যুক্তরাষ্ট্রের মজুত কমে যাওয়া এবং বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা একসঙ্গে তেলের বাজারে নতুন করে চাপ তৈরি করেছে। সর্বশেষ বাজার পরিস্থিতিতে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ৯০ ডলারের ওপরে অবস্থান করছে। সেপ্টেম্বরের শুরুতে কয়েক দফা উত্থানের পর ৪ সেপ্টেম্বর ব্রেন্ট প্রায় ৯৬ ডলার এবং ডব্লিউটিআই ৯১ ডলারের কাছাকাছি ওঠে।
তেলের দাম বৃদ্ধির সবচেয়ে বড় কারণগুলোর একটি এখন মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত ও সরবরাহ ঝুঁকি। ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে উত্তেজনা এবং পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে সামরিক পরিস্থিতির অবনতিতে আন্তর্জাতিক বাজারে ভবিষ্যৎ সরবরাহ নিয়ে আশঙ্কা বাড়ছে। বিশেষ করে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন পথ হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ায় বাজারে ঝুঁকি-প্রিমিয়াম বেড়েছে।
হরমুজ প্রণালির গুরুত্ব তেলের বাজারে নতুন করে সামনে এসেছে। এই পথ দিয়ে বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল ও জ্বালানি পরিবহন হয়। সাম্প্রতিক সময়ে এ পথে দৃশ্যমান তেল পরিবহন যুদ্ধ-পূর্ব সময়ের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। ফলে সরবরাহ স্বাভাবিক থাকবে কি না, তা নিয়ে ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের তেলের মজুত কমে যাওয়া। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২৮ আগস্ট শেষ হওয়া সপ্তাহে দেশটির বাণিজ্যিক অপরিশোধিত তেলের মজুত প্রত্যাশার চেয়ে বেশি কমেছে। এক সপ্তাহে মজুত কমেছে প্রায় ৪৫ লাখ ব্যারেল। একই সময়ে পরিশোধনাগারগুলোর কার্যক্রমও উচ্চ পর্যায়ে ছিল। এতে স্বল্পমেয়াদে বাজারে সরবরাহ নিয়ে চাপ তৈরি হয়েছে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো উৎপাদন ও সরবরাহের অনিশ্চয়তা। বিশ্বের বিভিন্ন তেল উৎপাদনকারী অঞ্চলে যুদ্ধ, নিষেধাজ্ঞা, অবকাঠামোগত সমস্যা ও পরিবহন ঝুঁকির কারণে উৎপাদন ও রপ্তানিতে বাধা তৈরি হয়েছে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (আইইএ) জানিয়েছে, ২০২৬ সালে বৈশ্বিক তেল সরবরাহ কমার আশঙ্কা রয়েছে এবং মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত সেই ঘাটতিকে আরও গভীর করতে পারে।
অন্যদিকে, ওপেক প্লাসের উৎপাদন নীতি তেলের বাজারে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলছে। জোটটি উৎপাদন বাড়ানোর কয়েকটি পদক্ষেপ নিলেও ভূরাজনৈতিক সংকটের কারণে বাস্তবে উৎপাদন ও সরবরাহ কাঙ্ক্ষিত হারে বাড়ছে না। ফলে উৎপাদন বাড়ানোর সিদ্ধান্তও বাজারের উদ্বেগ পুরোপুরি কমাতে পারছে না।
তেলের দাম বৃদ্ধির আরেকটি কারণ হলো বিশ্ববাজারে অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তা। যুদ্ধের আশঙ্কা, নিষেধাজ্ঞা, জাহাজ চলাচলের ঝুঁকি এবং গুরুত্বপূর্ণ উৎপাদন ও রপ্তানি অবকাঠামোতে হামলার আশঙ্কা বিনিয়োগকারীদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। ফলে সম্ভাব্য সরবরাহ ঘাটতির আশঙ্কায় আগাম তেল কেনার প্রবণতাও দাম বাড়াতে ভূমিকা রাখছে।
বাংলাদেশে কী প্রভাব পড়তে পারে
বাংলাদেশের জ্বালানি তেলের বাজার আন্তর্জাতিক দামের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত। দেশে পরিশোধিত ও অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের একটি বড় অংশ আমদানি করতে হয়। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম বাড়লে আমদানি ব্যয়, পরিবহন খরচ এবং সামগ্রিক জ্বালানি ব্যয়ের ওপর চাপ তৈরি হয়।
তবে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লেও সেপ্টেম্বর মাসের জন্য বাংলাদেশ সরকার ডিজেল, পেট্রোল, অকটেন ও কেরোসিনের খুচরা দাম অপরিবর্তিত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। অর্থাৎ বর্তমানে বিশ্ববাজারের বাড়তি চাপ সরাসরি খুচরা দামে প্রতিফলিত হচ্ছে না।
বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক না হলে এবং হরমুজ প্রণালিতে তেল পরিবহন পুরোপুরি স্বাভাবিক না হলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম আরও কিছুদিন উচ্চ পর্যায়ে থাকতে পারে। তবে সংঘাত কমে গিয়ে সরবরাহ স্বাভাবিক হলে বাজারে দাম কমার সম্ভাবনাও রয়েছে।
সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, হরমুজ প্রণালিতে সরবরাহ ঝুঁকি, বৈশ্বিক তেল মজুতের পরিবর্তন, উৎপাদন ঘাটতি, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এবং বাজারের অনিশ্চয়তা বর্তমানে তেলের দাম বৃদ্ধির প্রধান চালিকাশক্তি। বাংলাদেশের জন্যও পরিস্থিতিটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ দীর্ঘ সময় আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বেশি থাকলে আমদানি ব্যয় ও সামগ্রিক অর্থনীতিতে তার প্রভাব পড়তে পারে।
আপনার মতামত লিখুন :