জুলাইয়ের গণআন্দোলন, রাজনৈতিক পরিবর্তনের এক ঐতিহাসিক অধ্যায় : খায়রুল আলম সুমন


FavIcon
নিজস্ব প্রতিবেদক
  • প্রকাশিত : ০৪ আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

ছবির ক্যাপশন:

খায়রুল আলম সুমন :

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণআন্দোলন একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হয়। কয়েক সপ্তাহ ধরে চলা আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে নাটকীয় পরিবর্তন ঘটে। ওই দিন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে দেশ ত্যাগ করেন এবং ভারতে যান। এরপর দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে শুরু হয় এক নতুন অধ্যায়।

বিশ্লেষকদের মতে, এই আন্দোলনে দেশের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নেন। শিক্ষার্থী, শিক্ষক, শ্রমিক, কৃষক, চিকিৎসক, আইনজীবী, সাংবাদিক, ব্যবসায়ী, সাংস্কৃতিক কর্মী, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মী এবং সাধারণ মানুষ নিজ নিজ অবস্থান থেকে সম্পৃক্ত ছিলেন। অনেকে এটিকে একটি গণআন্দোলন হিসেবে অভিহিত করেন। একই সঙ্গে আন্দোলনের সময় বহু মানুষের প্রাণহানি ও আহত হওয়ার ঘটনাও দেশের ইতিহাসে গভীরভাবে স্মরণীয় হয়ে রয়েছে।

এই আন্দোলনের অন্যতম আলোচিত দুই নাম আবু সাঈদ ও মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধ (মুগ্ধ)। আন্দোলনের সময় আবু সাঈদের মৃত্যুর দৃশ্য এবং মুগ্ধের আন্দোলনকারীদের মাঝে পানি বিতরণের মুহূর্ত দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচিত হয়। পরে দুজনই নিহত হন। তাদের মৃত্যু আন্দোলনের প্রতীকী স্মৃতির অংশ হয়ে ওঠে এবং বিভিন্ন কর্মসূচিতে তাদের আত্মত্যাগ স্মরণ করা হয়। পাশাপাশি আন্দোলনে নিহত অন্যান্য ব্যক্তিদের প্রতিও দেশবাসী শ্রদ্ধা জানিয়ে আসছে।

রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূস অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন। তাঁর নেতৃত্বে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নেয়। সরকারের প্রধান দায়িত্ব ছিল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক করা, প্রশাসনিক কার্যক্রম সচল রাখা, প্রয়োজনীয় সংস্কার কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া এবং একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য জাতীয় নির্বাচনের পরিবেশ তৈরি করা।

অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব পালনকালে নির্বাচন ব্যবস্থা, প্রশাসন, বিচারব্যবস্থা, অর্থনীতি ও রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে সংস্কারের উদ্যোগ নেয়। এসব উদ্যোগ নিয়ে বিভিন্ন মহলে ইতিবাচক ও সমালোচনামূলক উভয় ধরনের মতামত দেখা যায়। কেউ এগুলোকে প্রয়োজনীয় সংস্কার হিসেবে মূল্যায়ন করেছেন, আবার কেউ বাস্তবায়নের গতি ও কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।

পরবর্তীতে ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হয় ১৩তম জাতীয় সংসদ নির্বাচন। নির্বাচনের ফলাফলের ভিত্তিতে ২০২৬ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করে। নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং নতুন সরকার রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নেয়।

নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর অর্থনীতি পুনরুদ্ধার, বিনিয়োগ বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, আইনশৃঙ্খলা উন্নয়ন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের সংস্কার, পরিবেশ সংরক্ষণ, দুর্নীতি দমন এবং প্রশাসনিক জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণের ঘোষণা দেয়।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সরকার পরিবর্তনের মাধ্যমে জনগণের প্রত্যাশাও নতুনভাবে সামনে এসেছে। দেশের মানুষ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার পাশাপাশি সুশাসন, আইনের শাসন, জবাবদিহিতা, দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের বাস্তব অগ্রগতি দেখতে চায়।

একই সঙ্গে বিশ্লেষকদের অভিমত, জুলাই-আগস্টের গণআন্দোলনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো জনগণের মতামত, নাগরিক অধিকার এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া। একটি শক্তিশালী ও টেকসই গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গড়ে তুলতে রাজনৈতিক দলগুলোর পারস্পরিক সহনশীলতা, সংলাপ এবং সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকর ভূমিকা অপরিহার্য।

তাদের মতে, যে কোনো গণআন্দোলনের প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করে আন্দোলনের ঘোষিত লক্ষ্য কতটা বাস্তবায়িত হয়েছে এবং জনগণের প্রত্যাশা কতটা পূরণ হয়েছে তার ওপর। তাই রাজনৈতিক পরিবর্তনের পাশাপাশি জনগণের জীবনমানের উন্নয়ন, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা বৃদ্ধি, মানবাধিকার রক্ষা এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

জুলাই-আগস্টের গণআন্দোলনের বর্ষপূর্তি উপলক্ষে দেশের বিভিন্ন স্থানে স্মরণসভা, আলোচনা, দোয়া মাহফিল ও নানা কর্মসূচি পালিত হচ্ছে। এসব আয়োজনে আন্দোলনে নিহত আবু সাঈদ, মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধসহ সকল শহীদকে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হচ্ছে। একই সঙ্গে আহতদের সুস্থতা কামনা এবং দেশের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রা, শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখার প্রত্যাশা ব্যক্ত করছেন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণআন্দোলন নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ৫ আগস্ট ২০২৪-এর রাজনৈতিক পরিবর্তন, ৮ আগস্ট ২০২৪-এ ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব গ্রহণ এবং ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এর জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এ নতুন সরকারের দায়িত্ব গ্রহণ দেশের রাজনীতিতে নতুন বাস্তবতার সূচনা করেছে। এখন জনগণের প্রধান প্রত্যাশা হলো গণতন্ত্র, সুশাসন, আইনের শাসন, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি এবং সকল নাগরিকের সমান অধিকার নিশ্চিত করে একটি শান্তিপূর্ণ, উন্নত ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তোলা।


ad728

আলোচিত শীর্ষ ১০ সংবাদ