অষ্ট্রেলিয়ায় ৪৬ মিলিয়ন ডলারের জালিয়াতি, ভুয়া ‘জ্যোতিষী’ ও তার মেয়ে আটক
নিজস্ব প্রতিবেদক
- প্রকাশিত : ১৩ নভেম্বর, ২০২৫ খ্রিস্টাব্দ
আন্তর্জাতিক ডেস্ক :
প্রতরণার অভিযোগে অষ্ট্রেলিয়ায় এক মা এবং তার মেয়েকে আটক করা হয়েছে। তারা নিজেদের একজনকে জ্যোতিষী এবং অন্যজনকে ‘ফেং শুইয়ের মাস্টার’ বলে দাবি করেছেন। ‘ফেং শুই’ হলো একটি প্রাচীন চীনা অনুশীলন। যা বাড়ি বা কর্মক্ষেত্রে ইতিবাচক শক্তিকে উন্নত করে এবং সুখ, সমৃদ্ধি ও সম্প্রীতি আনতে সাহায্য করে। এর মূল নীতি হলো পরিবেশের সঙ্গে ভারসাম্য তৈরি করা।
এই মা-মেয়ের বিরুদ্ধে প্রায় ৭০ মিলিয়ন অস্ট্রেলিয়ান ডলার (প্রায় ৪৬ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বা ৩৫ মিলিয়ন পাউন্ড) প্রতারণার অভিযোগ উঠেছে। পুলিশ জানায়, বুধবার সিডনির অভিজাত ডোভার হাইটস এলাকায় ৫৩ বছর বয়সী ওই নারী ও তার ২৫ বছর বয়সী মেয়েকে গ্রেপ্তার করা হয়। তারা একটি ‘অত্যন্ত সংগঠিত প্রতারণা এবং অর্থপাচার চক্রের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য’ ছিলেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
মা ভুক্তভোগীদের ঋণ নিতে রাজি করিয়েছিলেন। তিনি ভুক্তভোগীদের বোঝাতেন, তাদের ভবিষ্যতে একজন ‘বিলিয়নিয়ার’ দেখতে পাচ্ছেন। বৃহস্পতিবার আদালতে হাজির করার পর তাকে জামিন দেওয়া হয়নি। অন্যদিকে তার মেয়েকে জামিন দেওয়া হয়েছে, তবে তার মামলার শুনানি আগামী জানুয়ারিতে নির্ধারিত হয়েছে।
মায়ের বিরুদ্ধে ৩৯টি অভিযোগ আনা হয়েছে। যার মধ্যে রয়েছে একটি অপরাধী গোষ্ঠীর কার্যকলাপ পরিচালনা করা এবং প্রতারণার মাধ্যমে অসৎভাবে আর্থিক সুবিধা অর্জন করা। তার মেয়ের বিরুদ্ধে সাতটি অপরাধের অভিযোগ আনা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে বেপরোয়াভাবে অপরাধের অর্থ লেনদেন করা এবং একটি অপরাধী দলের অংশ হওয়া।
মিলিয়ন ডলারের প্রাসাদ থেকে তাদের গ্রেপ্তারের সময় পুলিশ আর্থিক নথি, মোবাইল ফোন, বিলাসবহুল হ্যান্ডব্যাগ, ১০ হাজার অস্ট্রেলীয় ডলার (৬,৫০০ ডলার, ৫,০০০ পাউন্ড) মূল্যের একটি ৪০ গ্রাম সোনার বার এবং ৬ হাজার ৬০০ অস্ট্রেলীয় ডলারের ক্যাসিনো চিপস জব্দ করে।
পুলিশ জানিয়েছে, মা তার অপরাধী চক্রের একজন প্রভাবশালী এবং বিশ্বস্ত সদস্য ছিলেন। ভাগ্য গণক হিসেবে তিনি নিয়মিত তার ক্লায়েন্টদের ভবিষ্যদ্বাণী দিতেন। এদের মধ্যে অনেকে নিজেদের আর্থিক সংকটের কথাও তার কাছে প্রকাশ করতেন।
পুলিশ জানায়, ওই মা নিজেকে ভাগ্য গণক হিসেবে পরিচয় দিতেন এবং নিয়মিত মানুষকে ভাগ্য গণনা করে দিতেন। তার অনেক ক্লায়েন্টই তাকে বলতেন, তারা আর্থিক সংকটে আছেন। তখন তিনি তাদের বোঝাতেন, খুব শিগগিরই একজন বিলিয়নিয়ার এসে তাঁদের সাহায্য করবেন। তবে সেটা তখনই সম্ভব, যদি তারা কোনো ঋণ নেয়। এইভাবে তিনি মানুষকে ঋণ নিতে প্ররোচিত করতেন এবং সেই অর্থের একটি অংশ নিজে রেখে দিতেন।
বুধবারের অভিযানে পুলিশ প্রায় ১ কোটি ৫০ লাখ অস্ট্রেলিয়ান ডলারের সম্পদ জব্দ করেছে। এর আগে একই মামলায় আরো ৬ কোটি ডলারের সম্পদ জব্দ করা হয়েছিল। এই তদন্তটি শুরু হয় গত বছর, ‘স্ট্রাইক ফোর্স মাইডলটন’ নামে একটি বিশেষ অভিযানের মাধ্যমে।
পুলিশ জানায়, এই চক্রটি চুরি করা পরিচয় ব্যবহার করে অস্তিত্বহীন বিলাসবহুল গাড়ির (যাকে তারা ‘ঘোস্ট কার’ বলত) জন্য ভুয়া ঋণ নিচ্ছিল। ফাইন্যান্সিয়াল ক্রাইমস স্কোয়াডের প্রধান গোয়েন্দা কর্মকর্তা গর্ডন আরবিনজা বলেন, ‘শুরুতে এটি ভুয়া গাড়ি ঋণ তদন্ত ছিল, কিন্তু এখন এটি আমার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে জটিল ও সংগঠিত আর্থিক অপরাধ চক্রগুলোর একটিতে পরিণত হয়েছে।’
পুলিশের অভিযোগ, এই চক্রটি একাধিক ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ব্যক্তিগত, ব্যবসায়িক এবং গৃহঋণ নিয়ে বড় আকারের প্রতারণা করেছে। সিডনি মর্নিং হেরাল্ড-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওই মা–মেয়ে ‘পেন্টহাউস সিন্ডিকেট’ নামে পরিচিত একটি প্রতারণা চক্রের অংশ। চক্রটির মূল নেতা সিডনির একটি ১ কোটি ৮০ লাখ অস্ট্রেলিয়ান ডলারের বিলাসবহুল পেন্টহাউসে থাকতেন।
এই চক্রটি দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যাংক কর্মকর্তাদের সহযোগিতায় প্রায় ২৫ কোটি অস্ট্রেলিয়ান ডলার ঋণ নিয়ে সিডনিতে একাধিক সম্পত্তি কিনেছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত এক ডজনের বেশি মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে প্রতারণা ও অর্থপাচারের অভিযোগ আনা হয়েছে। এটি অস্ট্রেলিয়ার ইতিহাসে অন্যতম বৃহত্তম আর্থিক অপরাধ মামলা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
পুলিশ জানিয়েছে, তদন্ত এখনও চলছে এবং আরো কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হতে পারে। এবার নজর দেওয়া হচ্ছে ওই চক্রের সহায়তাকারী আইনজীবী, হিসাবরক্ষক ও সম্পত্তি ব্যবসায়ীদের দিকে।
সূত্র : বিবিসি
আপনার মতামত লিখুন :