গানের সুরে মানুষের মুক্তির স্বপ্ন দেখেছিলেন শাহ আব্দুল করিম
সাহিত্য ডেস্ক :
ভাটির জল-হাওয়ায় বেড়ে ওঠা এক মানুষের কণ্ঠে ধ্বনিত হয়েছিল হাজারো মানুষের না-বলা কথা। হাওরের ঢেউ, কৃষকের ঘাম, জেলের দীর্ঘশ্বাস, শ্রমজীবী মানুষের বেঁচে থাকার লড়াই আর শোষিত মানুষের মুক্তির আকাঙ্ক্ষা মিশে আছে তাঁর গানের প্রতিটি পঙ্ক্তিতে। তিনি বাউলসম্রাট শাহ আব্দুল করিম। তাঁর গান কেবল সুরের মূর্ছনা নয়, সময় ও সমাজের বুকে রেখে যাওয়া এক গভীর জীবনদর্শন।
সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার উজানধল গ্রামের এক দরিদ্র পরিবারে জন্ম নেওয়া শাহ আব্দুল করিমের জীবন শুরু হয়েছিল অভাব আর অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে। শৈশব থেকেই তাঁকে দেখতে হয়েছে দারিদ্র্যের নির্মম বাস্তবতা। হাওরের বিস্তীর্ণ জলরাশি, ঋতুর সঙ্গে বদলে যাওয়া প্রকৃতি এবং প্রকৃতির সঙ্গে প্রতিনিয়ত লড়াই করে বেঁচে থাকা মানুষের জীবন ছিল তাঁর বেড়ে ওঠার পাঠশালা।
তিনি দেখেছেন, কৃষক মাঠে ফসল ফলান, জেলে নদী ও হাওরে মাছ ধরেন, শ্রমিক নিজের ঘাম ঝরিয়ে অন্যের সম্পদ গড়ে তোলেন। অথচ যাঁদের শ্রমে সমাজ ও অর্থনীতির চাকা ঘোরে, তাঁদের অনেকের জীবনেই জোটে না স্বাচ্ছন্দ্য কিংবা ন্যায্য প্রাপ্তি। এই বৈপরীত্য তাঁকে ভাবিয়েছে, ব্যথিত করেছে। সেই অনুভূতিই একসময় তাঁর গানের ভাষা হয়ে উঠেছে।
শাহ আব্দুল করিম মানুষের জীবনকে দূর থেকে পর্যবেক্ষণ করেননি। তিনি ছিলেন সেই জীবনেরই একজন অংশীদার। মানুষের সঙ্গে মিশেছেন, তাঁদের সুখ-দুঃখ অনুভব করেছেন, নিজের জীবনে দারিদ্র্য ও বঞ্চনার অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন। তাই তাঁর গানে মানুষের যে ছবি ফুটে উঠেছে, তা কল্পনার নয়; বরং জীবনের গভীর থেকে উঠে আসা এক বাস্তব প্রতিচ্ছবি।
বৈষম্যের বিরুদ্ধে সুরের প্রতিবাদ
শাহ আব্দুল করিমের গান শুনলে বোঝা যায়, তিনি শুধু প্রেম, বিরহ কিংবা প্রকৃতির সৌন্দর্য নিয়ে ভাবেননি। তাঁর চিন্তার জগতে ছিল সমাজের অসংগতি, মানুষের অধিকার এবং শোষণমুক্ত জীবনের আকাঙ্ক্ষা।
একদিকে সম্পদের পাহাড় গড়ে ওঠে, অন্যদিকে পরিশ্রম করেও বহু মানুষ দুবেলা খাবারের নিশ্চয়তা পান না। একদল মানুষের হাতে ক্ষমতা ও প্রাচুর্য জমা হয়, আরেক দল মানুষ বেঁচে থাকার ন্যূনতম অধিকারটুকু আদায়ের জন্য প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করে। এই অসম সমাজব্যবস্থার বিরুদ্ধে তাঁর গানে উচ্চারিত হয়েছে প্রতিবাদের সুর।
তাঁর প্রতিবাদ ছিল না কেবল উচ্চকণ্ঠ কোনো স্লোগান। সহজ কথার ভেতর দিয়ে তিনি মানুষের বিবেককে নাড়া দিতে চেয়েছেন। তাঁর গান প্রশ্ন তোলে, মানুষের মর্যাদা কি অর্থ ও সম্পদের মাপকাঠিতে নির্ধারিত হবে? যে মানুষ শ্রম দিয়ে পৃথিবীকে সচল রাখে, তার অধিকার ও সম্মান কেন অন্যের চেয়ে কম হবে?
এই প্রশ্নগুলো আজও আমাদের সমাজে সমানভাবে প্রাসঙ্গিক।
মানুষের চেয়ে বড় কোনো পরিচয় নেই
শাহ আব্দুল করিমের দর্শনের সবচেয়ে শক্তিশালী ভিত্তি ছিল মানবতা। মানুষের পরিচয় তাঁর কাছে সবার আগে। ধর্ম, বর্ণ, জাত, শ্রেণি কিংবা সামাজিক অবস্থানের বিভাজন দিয়ে মানুষকে বিচার করার প্রবণতা তাঁর মানবতাবাদী চিন্তার সঙ্গে কখনোই সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না।
বাউল দর্শনের উদারতা ও মানবপ্রেম তাঁর সৃষ্টিকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। মানুষের ভেতরেই তিনি খুঁজেছেন জীবনের অর্থ, ভালোবাসার সৌন্দর্য এবং সত্যের সন্ধান। তাঁর গানে তাই বারবার ফিরে এসেছে মানুষের প্রতি মানুষের দায়িত্ব, সহমর্মিতা ও ভালোবাসার আহ্বান।
তিনি যেন বলতে চেয়েছেন, মানুষের দুঃখ বুঝতে না পারলে কোনো দর্শনই পূর্ণতা পায় না। মানুষের পাশে দাঁড়াতে না পারলে ভালোবাসার কথাও অর্থহীন হয়ে পড়ে। এ কারণেই তাঁর গান শুধু শোনার বিষয় নয়, অনুভব করারও বিষয়।
‘আগে কী সুন্দর দিন কাটাইতাম’: স্মৃতির আড়ালে সময়ের ভাষ্য
শাহ আব্দুল করিমের বহুল পরিচিত গান ‘আগে কী সুন্দর দিন কাটাইতাম’ অনেকের কাছে অতীতের দিনগুলোর প্রতি এক মধুর স্মৃতিচারণ। কিন্তু গানটির আবেদন কেবল হারিয়ে যাওয়া সময়ের জন্য মন খারাপের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।
এই গানের ভেতরে রয়েছে মানুষের সম্পর্ক, সামাজিক বন্ধন এবং পারস্পরিক নির্ভরতার এক অনন্য ছবি। সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে মানুষের জীবনযাত্রা বদলেছে, বদলেছে সম্পর্কের ধরন, কমেছে অনেক ক্ষেত্রে পারস্পরিক আন্তরিকতা। অতীতের সেই সহজ-সরল জীবন আর বর্তমানের বাস্তবতার মধ্যে তিনি এক ধরনের ব্যবধান অনুভব করেছিলেন।
তাই গানটি শুনতে শুনতে শুধু অতীতের কথা মনে পড়ে না, বর্তমানকেও নতুন করে মূল্যায়ন করতে ইচ্ছা করে। আমরা কি সত্যিই উন্নত হয়েছি, নাকি উন্নতির পথে কোথাও হারিয়ে ফেলেছি মানুষের সঙ্গে মানুষের সহজ সম্পর্ক?
প্রান্তিক মানুষের কণ্ঠস্বর
শাহ আব্দুল করিমের গানের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো, সেখানে সমাজের প্রান্তিক মানুষ কখনোই উপেক্ষিত নয়। কৃষক, জেলে, শ্রমিক, দরিদ্র ও বঞ্চিত মানুষের জীবন তাঁর সৃষ্টিতে পেয়েছে বিশেষ মর্যাদা।
যাঁদের কথা অনেক সময় সমাজের ক্ষমতাবানদের আলোচনায় জায়গা পায় না, যাঁদের দুঃখ-কষ্ট সংবাদ কিংবা নীতিনির্ধারণের আড়ালে চাপা পড়ে যায়, তাঁদের কথাই তিনি গানের মাধ্যমে মানুষের সামনে তুলে ধরেছেন।
তাঁর গান আমাদের শুধু নিজের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য নিয়ে ভাবতে শেখায় না; অন্যের কষ্টের প্রতিও সংবেদনশীল হতে শেখায়। সমাজে একজন মানুষের বঞ্চনা যে শেষ পর্যন্ত পুরো সমাজেরই ব্যর্থতা, সেই উপলব্ধি তাঁর গানের অন্তর্নিহিত শক্তির অংশ।
বিভেদের সময়ে সম্প্রীতির আহ্বান
বর্তমান সমাজে নানা পরিচয়কে কেন্দ্র করে মানুষে মানুষে দূরত্ব বাড়ছে। ধর্মীয় পরিচয়, রাজনৈতিক মত, অর্থনৈতিক অবস্থান কিংবা সামাজিক মর্যাদা অনেক সময় মানুষের মধ্যে বিভেদের দেয়াল তৈরি করছে। অথচ মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয় যে সে মানুষ, সেই সহজ সত্যটিই যেন আমরা ভুলতে বসেছি।
এমন বাস্তবতায় শাহ আব্দুল করিমের গান নতুন করে আমাদের ভাবায়। তাঁর মানবতাবাদী দর্শন শেখায়, ভিন্নতা থাকতেই পারে, কিন্তু সেই ভিন্নতা যেন বিদ্বেষের কারণ না হয়। মতের অমিল যেন সম্পর্কের শত্রুতা তৈরি না করে। মানুষের প্রতি মানুষের ভালোবাসা ও শ্রদ্ধাই হোক সমাজের মূল ভিত্তি।
একটি শান্তিপূর্ণ ও সম্প্রীতিময় সমাজ গড়ে তুলতে আইন ও প্রশাসনিক উদ্যোগের পাশাপাশি মানুষের মনোজগতের পরিবর্তনও জরুরি। শাহ আব্দুল করিমের গান সেই পরিবর্তনের পথ দেখাতে পারে।
সময় বদলায়, কিন্তু তাঁর গানের আবেদন ফুরায় না
শাহ আব্দুল করিম আজ আমাদের মাঝে নেই। কিন্তু তাঁর সৃষ্টির মধ্য দিয়ে তিনি এখনো বেঁচে আছেন মানুষের অনুভূতিতে। তাঁর গানের আবেদন কোনো নির্দিষ্ট সময় কিংবা অঞ্চলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। কারণ তিনি যে অভাব, বৈষম্য, বঞ্চনা ও মানবিক সংকটের কথা বলেছেন, সেগুলোর অনেক কিছুই আজও আমাদের সমাজে বিদ্যমান।
এখনো অসংখ্য মানুষ শিক্ষা, চিকিৎসা, কর্মসংস্থান ও মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত। কৃষক ও শ্রমজীবী মানুষ তাঁদের শ্রমের ন্যায্য মূল্য পাওয়ার জন্য সংগ্রাম করেন। অর্থনৈতিক উন্নয়নের নানা পরিসংখ্যানের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের জীবনে সেই উন্নয়নের সুফল কতটা পৌঁছাচ্ছে, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
শাহ আব্দুল করিমের গান আমাদের সেই প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করায়। উন্নয়ন কি শুধু কিছু মানুষের জীবনে স্বাচ্ছন্দ্য নিয়ে আসবে, নাকি সমাজের প্রতিটি মানুষের জীবনমান উন্নত করবে? রাষ্ট্র ও সমাজের অগ্রযাত্রায় সবচেয়ে পিছিয়ে থাকা মানুষটির অধিকার কতটা নিশ্চিত হচ্ছে?
তাঁর গান যেন আমাদের মনে করিয়ে দেয়, মানুষের জীবন বদলাতে না পারলে উন্নয়নের পূর্ণতা আসে না।
নতুন প্রজন্মের কাছে যে উত্তরাধিকার
একজন শিল্পীর প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা শুধু তাঁর গান সংরক্ষণ কিংবা বিশেষ দিবসে তাঁকে স্মরণ করার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। তাঁর চিন্তা, দর্শন ও জীবনবোধকে ধারণ করাও জরুরি।
শাহ আব্দুল করিমের গান নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া প্রয়োজন। তবে শুধু সুর ও সংগীতের আনন্দে সীমাবদ্ধ না রেখে তাঁর গানের অন্তর্নিহিত মানবিক বার্তা, সাম্যের আকাঙ্ক্ষা এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী চেতনাকেও তুলে ধরতে হবে।
কারণ বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য কেবল আইন প্রণয়ন কিংবা নীতিমালা গ্রহণই যথেষ্ট নয়। মানুষের চিন্তা, মনন ও মূল্যবোধে পরিবর্তন আনাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। নতুন প্রজন্ম যদি তাঁর গান থেকে মানুষের প্রতি ভালোবাসা, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহস এবং পরের দুঃখে পাশে থাকার শিক্ষা গ্রহণ করে, তাহলেই তাঁর সৃষ্টির যথার্থ মূল্যায়ন হবে।
গানের ভেতর বেঁচে থাকা এক সমাজস্বপ্ন
শাহ আব্দুল করিম ছিলেন ভাটি বাংলার মাটির সন্তান, কিন্তু তাঁর গানের আবেদন ভাটির সীমানা ছাড়িয়ে ছড়িয়ে পড়েছে মানুষের হৃদয়ে। তাঁর সৃষ্টিতে যেমন আছে হাওরের ঢেউ, প্রকৃতির সৌন্দর্য, প্রেম ও বিরহ; তেমনি আছে ক্ষুধার্ত মানুষের দীর্ঘশ্বাস, শ্রমজীবী মানুষের বেদনা, শোষণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ এবং মানবমুক্তির স্বপ্ন।
তিনি সুরের আশ্রয়ে এমন এক সমাজের কথা বলেছেন, যেখানে মানুষের মধ্যে থাকবে না উঁচু-নিচুর বিভেদ, থাকবে না শোষণ ও বঞ্চনা। প্রত্যেক মানুষ পাবে তার প্রাপ্য সম্মান, অধিকার ও মর্যাদা।
তাঁর গানকে তাই কেবল লোকসংগীতের ঐতিহ্য হিসেবে বিবেচনা করলে তাঁর সৃষ্টির গভীরতা পুরোপুরি উপলব্ধি করা সম্ভব নয়। এসব গান একদিকে ভাটি বাংলার ইতিহাস ও সংস্কৃতির অমূল্য সম্পদ, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের অধিকার ও মানবিক মর্যাদার পক্ষে এক শক্তিশালী সাংস্কৃতিক দলিল।
শাহ আব্দুল করিমের পুত্র বাউল শাহ নূর জালাল বলেন, “আমার বাবা গণমানুষের পক্ষে গান গেয়েছেন। তাঁর গানের মূল বিষয় ছিল বৈষম্যহীন সমাজ গঠনের বার্তা। তিনি সবসময় মানুষ ও সম্প্রীতির জয়গান গেয়েছেন।”
বাবার গানের এই দর্শনই যেন তাঁর সৃষ্টির সবচেয়ে বড় পরিচয়। যে মানুষ নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে মানুষের কথা বলেছেন, তাঁর গান সময়ের সীমানা অতিক্রম করে মানুষের কাছেই ফিরে ফিরে আসে।
শাহ আব্দুল করিমের জীবনাবসান হয়েছে, কিন্তু তাঁর স্বপ্নের মৃত্যু হয়নি। তাঁর গানের প্রতিটি সুর আজও আমাদের সামনে একটি প্রশ্ন রেখে যায়—আমরা কি এমন একটি সমাজ গড়ে তুলতে পেরেছি, যেখানে মানুষ মানুষের জন্য বাঁচে, যেখানে শ্রমের মর্যাদা আছে, অধিকার নিশ্চিত এবং ভালোবাসার চেয়ে বড় কোনো বিভেদ নেই?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলেই আমরা আবার ফিরে যাব তাঁর গানের কাছে। কারণ শাহ আব্দুল করিম শুধু গান রচনা করেননি, তিনি গানের ভেতর দিয়ে এঁকেছিলেন একটি মানবিক, সাম্যভিত্তিক ও বৈষম্যহীন সমাজের স্বপ্ন। সেই স্বপ্নই তাঁকে বাঁচিয়ে রাখবে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে।
