সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অশ্লীলতা ও অপতথ্যের ছড়াছড়ি : খায়রুল আলম সুমন
নিজস্ব প্রতিবেদক
- প্রকাশিত : ২৭ অক্টোবর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
খায়রুল আলম সুমন :
রাষ্ট্রের শীর্ষ ব্যক্তি ও তাঁর পরিবারও রেহাই পাচ্ছেন না
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বর্তমান সময়ে মানুষের মতপ্রকাশ, তথ্য আদান-প্রদান ও যোগাযোগের অন্যতম প্রধান মাধ্যম। মুহূর্তের মধ্যে দেশ-বিদেশের খবর জানা, নিজের মতামত তুলে ধরা এবং জনমত গঠনে এই মাধ্যম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। কিন্তু সম্ভাবনাময় এই মাধ্যমের অপব্যবহারও দিন দিন উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে। অশ্লীলতা, অপতথ্য, গুজব, ব্যক্তিগত আক্রমণ, কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপপ্রচারে ভারী হয়ে উঠছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পরিবেশ।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, এই অপপ্রচারের শিকার হচ্ছেন সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে রাজনৈতিক নেতা, রাষ্ট্রের শীর্ষ ব্যক্তি এবং তাঁদের পরিবারের সদস্যরাও। ব্যক্তিগত জীবন, পারিবারিক সম্পর্ক কিংবা সামাজিক অবস্থানকে পুঁজি করে কাউকে হেয় করা, তাঁর চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তোলা কিংবা মিথ্যা তথ্য ছড়িয়ে জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করার প্রবণতা বাড়ছে। মতপ্রকাশের স্বাধীনতার আড়ালে এমন কর্মকাণ্ড কোনোভাবেই সুস্থ গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির পরিচয় হতে পারে না।
মতপ্রকাশের স্বাধীনতা গণতন্ত্রের অন্যতম ভিত্তি। কিন্তু স্বাধীনতা মানে যা খুশি তা বলা কিংবা অন্যের সম্মান ও অধিকার ক্ষুণ্ন করার অবাধ সুযোগ নয়। সমালোচনা, প্রশ্ন তোলা এবং ক্ষমতাসীনদের জবাবদিহির আওতায় আনা নাগরিক অধিকার। তবে সেই সমালোচনা হতে হবে তথ্যনির্ভর, যুক্তিসংগত ও দায়িত্বশীল। মিথ্যা অভিযোগ, অশ্লীল ভাষা কিংবা ব্যক্তিগত আক্রমণ কখনো গঠনমূলক সমালোচনার বিকল্প হতে পারে না।
বিশেষ করে নারী ও নারীনেত্রীদের লক্ষ্য করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অশালীন মন্তব্য, ব্যক্তিগত ছবি বা তথ্যের অপব্যবহার এবং চরিত্রহননের চেষ্টা সমাজের জন্য ভয়াবহ বার্তা বহন করে। কোনো নারী রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হলেই তাঁর ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে কটূক্তি করার অধিকার কারও জন্মায় না। মতাদর্শগত বিরোধ থাকতেই পারে, রাজনৈতিক বিতর্কও চলতে পারে। কিন্তু সেই বিরোধকে ব্যক্তিগত অপমান, যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্য কিংবা পরিবারকে আক্রমণের হাতিয়ারে পরিণত করা নৈতিকতার চরম অবক্ষয়।
অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, কোনো ঘটনা ঘটার পর প্রকৃত তথ্য যাচাই না করেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা ধরনের বক্তব্য ছড়িয়ে দেওয়া হয়। আবেগপ্রবণ মন্তব্য, সম্পাদিত ছবি, পুরোনো ভিডিও কিংবা বিভ্রান্তিকর শিরোনাম ব্যবহার করে একটি ঘটনাকে ভিন্নভাবে উপস্থাপন করা হয়। পরে সেই তথ্যের সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠলেও প্রাথমিক অপপ্রচারের ক্ষতি আর সহজে পূরণ করা যায় না। কারণ, মিথ্যা তথ্যের বিস্তার অনেক সময় সত্য প্রকাশের গতিকেও ছাড়িয়ে যায়।
রাজনৈতিক অঙ্গনেও এ ধরনের প্রবণতা উদ্বেগজনক। রাজনৈতিক মতপার্থক্যকে কেন্দ্র করে প্রতিপক্ষকে হেয় করা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমন্বিতভাবে আক্রমণ চালানো কিংবা ভুয়া পরিচয়ে বিভিন্ন বক্তব্য ছড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগ প্রায়ই সামনে আসে। এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই করা জরুরি। তবে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী যদি পরিকল্পিতভাবে ভুয়া পরিচয়, মিথ্যা তথ্য কিংবা অপমানজনক বক্তব্যের মাধ্যমে জনমতকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করে, তাহলে তা শুধু ব্যক্তির সুনাম ক্ষুণ্ন করে না; গণতান্ত্রিক আলোচনার পরিবেশকেও বিষিয়ে তোলে।
রাষ্ট্রের শীর্ষ ব্যক্তি ও তাঁদের পরিবারের সদস্যদের ঘিরেও যখন যাচাইহীন তথ্য, কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য এবং ব্যক্তিগত আক্রমণ ছড়িয়ে পড়ে, তখন বিষয়টি আরও সংবেদনশীল হয়ে ওঠে। রাষ্ট্রীয় দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের কাজের সমালোচনা করার অধিকার জনগণের রয়েছে। তাঁদের সিদ্ধান্ত, নীতি ও কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রশ্ন তোলা গণতন্ত্রের স্বাভাবিক চর্চা। কিন্তু দায়িত্ব পালনের মূল্যায়নের বদলে ব্যক্তিগত জীবন বা পরিবারের সদস্যদের লক্ষ্য করে অপপ্রচার চালানো কোনোভাবেই দায়িত্বশীল রাজনৈতিক আচরণ নয়।
একইভাবে, কোনো ব্যক্তির পরিচয়, পেশা কিংবা সামাজিক অবস্থান বিবেচনা না করে তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ ছড়িয়ে দেওয়া উচিত নয়। অভিযোগ থাকলে তার পক্ষে প্রমাণ উপস্থাপন করতে হবে এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ রাখতে হবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে বিচারালয় বানিয়ে কাউকে অপরাধী ঘোষণা করা ন্যায়বিচারের নীতির পরিপন্থী।
সাম্প্রতিক সময়ে আন্তর্জাতিক ঘটনাবলি নিয়েও বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে পড়তে দেখা যায়। মহাকাশ অভিযান, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অগ্রগতি কিংবা আন্তর্জাতিক রাজনীতির বিভিন্ন ঘটনাকে কেন্দ্র করে কখনো পুরোনো ছবি, কখনো ভুল ব্যাখ্যা, আবার কখনো সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন দাবি প্রচার করা হয়। এসব তথ্য যাচাই না করে ভাগ করে নেওয়ার ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে ভুল ধারণা তৈরি হয়। তাই আন্তর্জাতিক সংবাদ বা বৈজ্ঞানিক কোনো তথ্য প্রচারের আগে নির্ভরযোগ্য সংবাদমাধ্যম ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের আনুষ্ঠানিক সূত্র যাচাই করা প্রয়োজন।
অপতথ্য মোকাবিলায় তথ্য যাচাইকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। তবে কোনো নির্দিষ্ট সময়ে কতটি অপতথ্য শনাক্ত হয়েছে, কোন ব্যক্তি বা রাজনৈতিক দলকে কেন্দ্র করে সবচেয়ে বেশি বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়েছে কিংবা আগের বছরের তুলনায় অপতথ্যের পরিমাণ কতটা বেড়েছে, এসব বিষয়ে সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনের তথ্য নিশ্চিত করা জরুরি। যাচাই করা তথ্যই পারে অপতথ্যের বিরুদ্ধে জনসচেতনতা তৈরি করতে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অশ্লীলতা ও অপতথ্যের বিস্তার রোধে শুধু আইন প্রয়োগের ওপর নির্ভর করলেই চলবে না। প্রয়োজন সামাজিক সচেতনতা, গণমাধ্যমের দায়িত্বশীলতা, ডিজিটাল সাক্ষরতা এবং ব্যক্তিগত নৈতিকতার উন্নয়ন। কোনো পোস্ট দেখেই তা বিশ্বাস করা বা অন্যের কাছে ছড়িয়ে দেওয়ার আগে তথ্যের উৎস যাচাই করতে হবে। সন্দেহজনক ছবি, ভিডিও কিংবা বক্তব্যের সত্যতা নিশ্চিত না হয়ে সেগুলো প্রচার করা থেকে বিরত থাকতে হবে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যবহারকারীদের মনে রাখতে হবে, একটি মিথ্যা পোস্ট কারও ব্যক্তিগত জীবন, পারিবারিক সম্পর্ক, পেশাগত ভবিষ্যৎ ও সামাজিক মর্যাদার ওপর দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলতে পারে। অনলাইনে লেখা প্রতিটি শব্দের পেছনে বাস্তব মানুষের অনুভূতি ও অধিকার জড়িয়ে রয়েছে। তাই ডিজিটাল পরিসরে দায়িত্বশীল আচরণ করা কেবল সৌজন্যের বিষয় নয়, এটি নাগরিক দায়িত্বেরও অংশ।
একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মকে হয়রানি, ভুয়া পরিচয়, ব্যক্তিগত তথ্যের অপব্যবহার এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপপ্রচারের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। অভিযোগ পর্যালোচনার ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি, যাতে প্রকৃত হয়রানির শিকার ব্যক্তি সুরক্ষা পান এবং বৈধ মতপ্রকাশ অযথা বাধাগ্রস্ত না হয়। আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রেও ন্যায়সংগত প্রক্রিয়া ও নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।
রাজনৈতিক দলগুলোরও এ ক্ষেত্রে দায়িত্ব রয়েছে। দলীয় সমর্থকদের নামে পরিচালিত কোনো অনলাইন কর্মকাণ্ড যদি মিথ্যা তথ্য, ব্যক্তিগত আক্রমণ কিংবা নারীর প্রতি অবমাননাকর আচরণকে উৎসাহিত করে, তাহলে সংশ্লিষ্ট দলগুলোর উচিত তা স্পষ্টভাবে নিরুৎসাহিত করা। রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকবে, মতের ভিন্নতা থাকবে, কিন্তু সেই প্রতিযোগিতা যেন মিথ্যাচার ও চরিত্রহননের সংস্কৃতিতে পরিণত না হয়।
আমাদের মনে রাখতে হবে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম মানুষের কণ্ঠস্বর তুলে ধরার জায়গা, কাউকে অপমান করার অস্ত্র নয়। এখানে যেমন সরকারের সমালোচনা করা যাবে, তেমনি বিরোধী মতও প্রকাশ করা যাবে। কিন্তু কোনো পক্ষের বিরুদ্ধেই মিথ্যা তথ্য, অশ্লীলতা কিংবা ব্যক্তিগত আক্রমণকে স্বাভাবিক বলে মেনে নেওয়া যায় না।
একটি সুস্থ সমাজ গঠনের জন্য প্রয়োজন সত্যের প্রতি দায়বদ্ধতা, ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধা এবং মানুষের ব্যক্তিগত মর্যাদা রক্ষার অঙ্গীকার। রাষ্ট্রের শীর্ষ ব্যক্তি হোন কিংবা সাধারণ নাগরিক, প্রত্যেকেরই সম্মান ও অধিকার রয়েছে। সেই অধিকার রক্ষা করা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে তথ্যভিত্তিক, শালীন ও দায়িত্বশীল আলোচনার ক্ষেত্র হিসেবে গড়ে তোলা আমাদের সবার দায়িত্ব।
লেখক : খায়রুল আলম সুমন, প্রতিষ্ঠাতা ও সভাপতি : সিলেট বিভাগীয় প্রেসক্লাব।
আপনার মতামত লিখুন :