পর্যটকদের আগ্রহ বাড়ছে, তবে ধ্বংসের মুখে হোসেনপুরের ঐতিহাসিক নীলকুঠি
নিজস্ব প্রতিবেদক
- প্রকাশিত : ২১ জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
মো: মানসুরুল হক রবিন, হোসেনপুর (কিশোরগঞ্জ) প্রতিনিধি :
কিশোরগঞ্জের হোসেনপুর উপজেলার ব্রিটিশ শাসনামলের নীল চাষ ও নীলকরদের নির্মম নির্যাতনের ইতিহাস বহনকারী প্রায় ২৬৫ বছরের পুরোনো ঐতিহাসিক নীলকুঠি আজও অতীতের নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। প্রতিদিনই এই ঐতিহাসিক স্থাপনাটি দেখতে দূর-দূরান্ত থেকে দর্শনার্থী ও ইতিহাসপ্রেমীরা ছুটে এলেও দীর্ঘদিনের অবহেলা ও সংস্কারের অভাবে এটি এখন বিলুপ্তির ঝুঁকিতে পড়েছে। দ্রুত সংরক্ষণ ও সংস্কারের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দা, ইতিহাসবিদ, সুশীল সমাজ ও সচেতন মহল।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, উপজেলার ২ নম্বর সিদলা ইউনিয়নের চৌদার এলাকায় অবস্থিত এই নীলকুঠি একসময় ব্রিটিশ নীলকরদের আবাসস্থল হিসেবে ব্যবহৃত হতো। পাশের টান সিদলা গ্রামে ছিল নীলকুঠির কার্যালয় এবং একটি বিশাল পুকুর, যা এখনো সেই সময়ের স্মৃতি বহন করছে।
ইতিহাসবিদদের মতে, আনুমানিক ১৭৩০ থেকে ১৭৬০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি হোসেনপুরে নীলকুঠি স্থাপন করে। এরপর স্থানীয় কৃষকদের ওপর নানা নির্যাতন চালিয়ে জোরপূর্বক নীল চাষে বাধ্য করা হতো। এখান থেকে উৎপাদিত নীল ইংল্যান্ডে রপ্তানি করা হতো এবং দীর্ঘদিন এ অঞ্চলে নীল ব্যবসা পরিচালিত হয়।
সরেজমিনে তথ্য সংগ্রহকালে হোসেনপুর আদর্শ মহিলা কলেজের ইতিহাস বিভাগের সাবেক বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক এম.এ. হাকিম জানান, ইংরেজ আমলে ফ্রান্সের অধিবাসী মাইকেল প্যাটেল চৌদার এলাকায় কারুকার্যময় একটি দৃষ্টিনন্দন ভবন নির্মাণ করেন। পরবর্তীতে এই ভবন থেকেই এলেনবেথ হেনসন এ অঞ্চলের নীল চাষ নিয়ন্ত্রণ করতেন। জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত হওয়ার পর ভবনটি কিশোরগঞ্জের সাবেক জেলা সমবায় কর্মকর্তা প্রয়াত উম্মেদ আলী ক্রয় বা লিজের মাধ্যমে অধিগ্রহণ করেন এবং এর নামকরণ করেন 'আমেনা মঞ্জিল'। বর্তমানে ভবনটি ওই নামেই পরিচিত।
স্থানীয়দের ভাষ্য, টান সিদলা বাবুর বাজার এলাকায় নীলকরদের কার্যালয়ের ধ্বংসাবশেষ এবং পাশের বিশাল পুকুরটি এখনো ইতিহাসের সাক্ষ্য বহন করছে। তবে যথাযথ সংরক্ষণের অভাবে ঐতিহাসিক নিদর্শনগুলো ধীরে ধীরে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
হোসেনপুর সরকারি কলেজের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক, লেখক ও গবেষক এবিএম ছিদ্দিক চঞ্চল, প্রবীণ বাসিন্দা টুনু মুন্সি, শিক্ষক বিল্লাল মিয়া, কুদরত আলীসহ অনেকেই জানান, ব্রিটিশ শাসনামলে কৃষকদের জোরপূর্বক নীল চাষে বাধ্য করা হতো। যারা নীল চাষে অস্বীকৃতি জানাতেন, তাদের ওপর চালানো হতো অমানবিক নির্যাতন। সেই ইতিহাস ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে নীলকুঠির সংরক্ষণ অত্যন্ত জরুরি।
গড়মাছুড়া গ্রামের সমাজকর্মী মো. ওয়াহিদ মিয়াসহ স্থানীয়দের দাবি, ঐতিহাসিক এই স্থাপনাটি প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন হিসেবে সংরক্ষণ করা হলে একদিকে যেমন ইতিহাস রক্ষা পাবে, অন্যদিকে এটি পর্যটন সম্ভাবনাও সৃষ্টি করবে। তাই প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দ্রুত হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন তারা।
এ বিষয়ে হোসেনপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কাজী নাহিদ ইভা বলেন, উপজেলায় যোগদানের পর তিনি জানতে পেরেছেন যে নীলকুঠিটি বহু বছরের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের ধারক। খুব শিগগিরই স্থাপনাটি পরিদর্শন করে এর সংরক্ষণ ও সংস্কারের বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে তিনি আশ্বাস দিয়েছেন।
আপনার মতামত লিখুন :