ভিসা জটিলতার ফাঁদে বাংলাদেশিরা, কেন একে একে বন্ধ হচ্ছে বিদেশের দরজা!
নিজস্ব প্রতিবেদক
- প্রকাশিত : ০৭ আগস্ট, ২০২৫ খ্রিস্টাব্দ
আলী মোহাম্মদ :
বিশ্ব আজ অনেক বেশি সংযুক্ত, প্রযুক্তিনির্ভর এবং চলাচলের স্বাধীনতায় উন্মুক্ত। অথচ এই বিশ্বেই বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের জন্য ধীরে ধীরে সংকুচিত হয়ে আসছে আন্তর্জাতিক দরজা। সাম্প্রতিক সময়ে এমনকি কাজাখস্তানের মতো তুলনামূলকভাবে ‘সহজ’ দেশে ভ্রমণ করতে গিয়েও বাংলাদেশিরা মুখোমুখি হচ্ছেন ভিসা রিজেকশনের। প্রশ্ন উঠছে- কেন এমন হচ্ছে? কেন একের পর এক দেশ বাংলাদেশের নাগরিকদের প্রতি কঠোর হয়ে উঠছে?
বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশের ভিসা আবেদনকারীদের প্রতি বাড়ছে বৈশ্বিক অনাস্থা। এর মূল কারণগুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে ওভারস্টে করার প্রবণতা। অনেকেই বৈধভাবে ভিসা নিয়ে বিদেশে গিয়ে আর ফিরে আসেন না। কেউ কেউ রাজনৈতিক আশ্রয় প্রার্থনা করেন, কেউ আবার ট্রানজিট দেশে থেকে ইউরোপ বা অন্য কোথাও চলে যাওয়ার চেষ্টা করেন। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাম্প্রতিক রিপোর্ট বলছে, দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশিদের অবৈধভাবে অবস্থানের হার সবচেয়ে বেশি। এসব ঘটনার কারণে অনেক দেশ মনে করে, বাংলাদেশি নাগরিকরা পর্যটক বা ছাত্র পরিচয়ে গিয়ে বাস্তবে অভিবাসী হয়ে থাকতে চায়।
আরেকটি বড় কারণ হলো, অনেক আবেদনকারী বা তাদের নিয়োজিত ভিসা এজেন্ট ভুয়া কাগজপত্র জমা দেন। নকল ইনভাইটেশন লেটার, ভুয়া চাকরির কাগজ, এমনকি ব্যাংক স্টেটমেন্ট পর্যন্ত বানানো হচ্ছে যার প্রমাণ বহু দূতাবাস পেয়েছে। ফলাফল স্বরূপ, সৎ ও প্রকৃত ভ্রমণেচ্ছুকরাও রিজেকশনের শিকার হচ্ছেন।
Henley Passport Index অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বাংলাদেশি পাসপোর্টের র্যাংকিং রয়েছে ৯৮তম। বিশ্বে খুব কম দেশেই বাংলাদেশিরা ভিসা ছাড়া প্রবেশ করতে পারেন। এ ধরনের দুর্বল পাসপোর্ট র্যাংকিং বিশ্বে বাংলাদেশি পাসপোর্টধারীদের প্রতি আগ্রহ কমিয়ে দিচ্ছে এবং যাচাই-বাছাইয়ের মাত্রা বাড়িয়ে তুলছে।
বাংলাদেশের অভ্যন্তরেও রয়েছে বড় একটি সমস্যা- ভিসা ব্যবসা। বহু ভুয়া এজেন্সি বা তথাকথিত কনসালটেন্ট’ মানুষকে মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে বিদেশে পাঠানোর চেষ্টা করেন। অনেকেই জানেন না তারা কোথায় যাচ্ছেন বা কেন যাচ্ছেন- শুধু “ভিসা হয়ে গেছে” এই কথার ওপর ভিত্তি করে পাসপোর্ট জমা দেন। এসব কারণে বিভিন্ন দেশের দূতাবাসগুলো বাংলাদেশের আবেদনকারীদের প্রতি আরও কঠোর হচ্ছে।
যেসব দেশ একসময় বাংলাদেশিদের জন্য উন্মুক্ত ছিল, তারাও এখন সতর্ক। কাজাখস্তানের মতো দেশ, যেখানে আগে সহজেই ই-ভিসা পাওয়া যেত, এখন সেই একই প্রক্রিয়ায় একাধিক আবেদনকারী রিজেক্ট হচ্ছেন।
এমন পরিস্থিতি শুধু কাজাখস্তানে নয় বরং মালয়েশিয়া, দুবাই, তুরস্ক, আজারবাইজান এমনকি পূর্ব ইউরোপীয় কিছু দেশও এখন বাংলাদেশি আবেদনকারীদের অতিরিক্ত কাগজপত্র চাইছে, অথবা সরাসরি রিজেক্ট করছে। আন্তর্জাতিকভাবেও বাংলাদেশি আবেদনকারীদের মাঝে ‘ইমিগ্রেশন রিস্ক’ রয়েছে বলে বিবেচনা করা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সংকট মোকাবেলার জন্য বাংলাদেশের দরকার প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের শিক্ষক ড. রাশেদুল হাসান বলেন, “বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতা, আর বিদেশমুখী তরুণ প্রজন্মের মানসিকতা, বিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি নষ্ট করছে। সরকার যদি এখনই পদক্ষেপ না নেয়, আরও অনেক দেশের দরজাই বন্ধ হয়ে যাবে।”
সমাধান হিসেবে প্রস্তাব করা হচ্ছে, সরকারিভাবে সচেতনতা বৃদ্ধির উদ্যোগ, দালালচক্র নির্মূল, আবেদনকারীদের প্রামাণ্যতা যাচাই এবং বিদেশে অবস্থানরত প্রবাসীদের ইমেজ উন্নয়নের কাজ। এর পাশাপাশি আবেদনকারীদের মধ্যেও থাকতে হবে সততা, স্বচ্ছতা ও বাস্তবতা।
শেষ কথায় বলা যায়, আজকের বিশ্বে ভিসা কেবল একটি অনুমতি নয়, এটি একটি বিশ্বাসের প্রতীক। সেই বিশ্বাস যখন হারিয়ে যায়, তখন দরজাও বন্ধ হয়ে যায়। বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য আবার সেই দরজা খুলতে হলে, ব্যক্তি থেকে রাষ্ট্র সবার দায়িত্ব আছে সততার সঙ্গে সামনে এগিয়ে যাওয়ার।
আপনার মতামত লিখুন :