পদ্মা ব্যারাজে বদলাবে দক্ষিণ-পশ্চিমের ভবিষ্যৎ, কৃষি ও অর্থনীতিতে বড় রূপান্তরের আশা


FavIcon
নিজস্ব প্রতিবেদক
  • প্রকাশিত : ২০ জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

ছবির ক্যাপশন:

নিউজ বাংলা ডেস্ক :

দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের দীর্ঘদিনের উন্নয়ন প্রত্যাশায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে কৃষি উৎপাদন, কর্মসংস্থান, নদী ব্যবস্থাপনা এবং আঞ্চলিক অর্থনীতিতে ব্যাপক পরিবর্তন আসবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। সরকারের হিসাবে, এই প্রকল্পের সুফল সরাসরি ও পরোক্ষভাবে পৌঁছাবে ২৪ জেলার প্রায় পাঁচ কোটি মানুষের কাছে।

পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ বলেন, পদ্মা ব্যারাজ কেবল একটি অবকাঠামোগত প্রকল্প নয়, এটি দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের জীবন ও জীবিকার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। দীর্ঘদিনের নাব্য সংকট, শুষ্ক মৌসুমে পানির অভাব এবং অপরিকল্পিত নদী ব্যবস্থাপনার কারণে এই অঞ্চলের সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগানো যায়নি। ব্যারাজ বাস্তবায়নের মাধ্যমে সেই সীমাবদ্ধতা দূর হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

প্রতিমন্ত্রীর ভাষ্য অনুযায়ী, প্রকল্পটি কার্যকর হলে নদী ব্যবস্থাপনা, পানি সংরক্ষণ, সেচ সুবিধা সম্প্রসারণ, নদীভাঙন রোধ এবং বন্যা নিয়ন্ত্রণে বাস্তব পরিবর্তন আসবে। এর ফলে ১৬১টি উপজেলার কৃষি উৎপাদন বাড়বে, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং আঞ্চলিক অর্থনীতিতে গতি ফিরবে।

কৃষিবিদ ও গবেষকদের মতে, প্রকল্প বাস্তবায়নের ফলে প্রায় দুই লাখ হেক্টরের বেশি এক ফসলি জমি দুই ফসলি এবং এক লাখ হেক্টরের বেশি জমি তিন ফসলি জমিতে রূপান্তরিত হতে পারে। লবণাক্ত পানির প্রভাব কমে কৃষকের জমিতে মিঠা পানি পৌঁছালে জমির উর্বরতা বাড়বে এবং খাদ্য উৎপাদনে বড় ধরনের অগ্রগতি আসবে। বছরে অতিরিক্ত কয়েক মিলিয়ন টন খাদ্যশস্য উৎপাদনের সম্ভাবনাও দেখছেন তারা।

বর্তমানে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে বোরো ধানের গড় উৎপাদন হেক্টরপ্রতি ৪.৫ থেকে ৫ টন। নিরবচ্ছিন্ন সেচ ও আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে তা ৬ থেকে ৭ টনে উন্নীত করা সম্ভব বলে মনে করছেন কৃষি গবেষকরা। একইভাবে গম, ভুট্টা ও আলুর উৎপাদনও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে।

পদ্মা পাড়ের রাজবাড়ীর গোয়ালন্দের সংসদ সদস্য ও সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম বলেন, এই প্রকল্প বাস্তবায়নের অপেক্ষায় আছে পদ্মা পাড়ের মানুষ। তার ভাষায়, প্রধানমন্ত্রীর আন্তরিক উদ্যোগ ছাড়া এ প্রকল্প বাস্তবায়ন সম্ভব হতো না। একনেকে অনুমোদনের মধ্য দিয়ে পদ্মা ব্যারাজ এখন আর স্বপ্ন নয়, বাস্তবতার পথে এগোচ্ছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, পদ্মা নদীর বাংলাদেশ অংশের দৈর্ঘ্য প্রায় ৩৪১ কিলোমিটার। নদীভাঙনের কারণে গত দুই দশকে আট থেকে দশ হাজার হেক্টরের বেশি কৃষিজমি বিলীন হয়েছে এবং প্রতিবছর গড়ে ১০ থেকে ১৫ হাজার পরিবার সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, নিয়মিত ড্রেজিং, তীর সংরক্ষণ বাঁধ ও নিয়ন্ত্রিত পানি প্রবাহ নিশ্চিত করা গেলে নদীভাঙনের হার ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমানো সম্ভব।

সরকার প্রায় ৩৪ হাজার ৪৯৭ কোটি টাকা ব্যয়ে সম্পূর্ণ নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প বাস্তবায়নের অনুমোদন দিয়েছে। লক্ষ্য অনুযায়ী, ২০৩৩ সালের জুনের মধ্যে প্রকল্পের কাজ শেষ করার পরিকল্পনা রয়েছে।

অর্থনীতিবিদ ও উন্নয়ন বিশ্লেষকদের মতে, কৃষি উৎপাদন বাড়ার পাশাপাশি পরিবহন, সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বিপণন খাতে ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। দীর্ঘমেয়াদে এক থেকে দুই লাখ নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে। পাশাপাশি কৃষকের আয় গড়ে ২৫ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ার সম্ভাবনাও রয়েছে।

সব মিলিয়ে, পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নদী, কৃষি ও মানুষের জীবনে একটি নতুন অধ্যায় সূচনার পথে। সফল বাস্তবায়ন হলে এটি দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি ও খাদ্যনিরাপত্তায়ও বড় অবদান রাখবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।


ad728

আলোচিত শীর্ষ ১০ সংবাদ