নিচের লেখাটি A4 কাগজে যেভাবে দেখাবে, ঠিক সেভাবেই প্রিন্ট হবে।
ফিরে যান
Logo
,

স্কুল ফিডিংয়ে পচা খাবারে শিশুদের স্বাস্থ্যের সঙ্গে আপস নয়, চাই কঠোর নজরদারি

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত : ০৬ নভেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
স্কুল ফিডিংয়ে পচা খাবারে শিশুদের স্বাস্থ্যের সঙ্গে আপস নয়, চাই কঠোর নজরদারি
সম্পাদকীয়

প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিশুদের মুখে খাবার তুলে দেওয়ার উদ্যোগ নিঃসন্দেহে একটি প্রশংসনীয় সামাজিক কর্মসূচি। ক্ষুধা ও অপুষ্টি দূর করা, বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি বাড়ানো এবং পড়াশোনায় আগ্রহী করে তোলার লক্ষ্য নিয়ে চালু হওয়া এই কর্মসূচি দেশের প্রাথমিক শিক্ষার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। কিন্তু সেই খাবারই যদি শিশুদের অসুস্থতার কারণ হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে এর চেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় আর কী হতে পারে?

দেশের বিভিন্ন প্রাথমিক বিদ্যালয়ে স্কুল ফিডিং কর্মসূচির আওতায় সরবরাহ করা নিম্নমানের, বাসি ও পচা খাবার খেয়ে শিক্ষার্থীদের অসুস্থ হয়ে পড়ার ঘটনা কর্মসূচিটির ব্যবস্থাপনা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে। এটি কোনো বিচ্ছিন্ন অবহেলা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। কারণ, একই ধরনের অভিযোগ বারবার সামনে আসছে। চাঁপাইনবাবগঞ্জে গত কয়েক মাসে একাধিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের অসুস্থ হওয়ার খবর প্রকাশিত হয়েছে। ২০২৬ সালের ১৫ অক্টোবর প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জেলার ছয়টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ছয় মাসে শতাধিক শিক্ষার্থী অসুস্থ হওয়ার তথ্য উঠে আসে। এর আগে ৩০ সেপ্টেম্বর শিবগঞ্জের লহলামারী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে স্কুল ফিডিংয়ের খাবার খেয়ে ১২ শিক্ষার্থী অসুস্থ হয়। ঘটনাটি তদন্তে ছয় সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়। 

এসব ঘটনা প্রমাণ করে, খাবারের মান নিয়ন্ত্রণ ও সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের দুর্বলতা রয়েছে। তদন্ত কমিটি গঠন কিংবা ঘটনার পর সাময়িক ব্যবস্থা গ্রহণই যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন এমন একটি কার্যকর তদারকি ব্যবস্থা, যাতে কোনো বিদ্যালয়ে নিম্নমানের বা অনিরাপদ খাবার পৌঁছানোর সুযোগ না থাকে।

শুধু ঠিকাদার নয়, দায় এড়াতে পারেন না সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারাও

স্কুল ফিডিং কর্মসূচির খাবার নিম্নমানের বা পচা হওয়ার জন্য শুধু সরবরাহকারী ঠিকাদারকে দায়ী করলেই সমস্যার পূর্ণ সমাধান হবে না। এর সঙ্গে জড়িত রয়েছে পুরো সরবরাহ ও ব্যবস্থাপনা প্রক্রিয়া। খাবার গ্রহণ, মান যাচাই, পরিমাণ নির্ধারণ এবং বিদ্যালয়ে বিতরণের প্রতিটি ধাপে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের ভূমিকা রয়েছে।

প্রশ্ন উঠেছে, ঠিকাদার খাবার সরবরাহ করার পর তা যথাযথভাবে পরীক্ষা করা হয় কি না। খাবারের মান, উৎপাদনের তারিখ, মেয়াদ, সংরক্ষণব্যবস্থা ও পরিবহনের পরিবেশ যাচাই না করেই যদি সেগুলো শিক্ষার্থীদের হাতে তুলে দেওয়া হয়, তাহলে এ ধরনের বিপর্যয় ঘটতেই থাকবে।

এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কোনো কর্মকর্তা দায়িত্বে অবহেলা করেছেন কি না, ঠিকাদারের সঙ্গে অনৈতিক আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে অনিয়মের সুযোগ তৈরি হয়েছে কি না, সেটিও তদন্ত করে দেখা জরুরি। তবে অভিযোগের ভিত্তিতে কাউকে দোষী সাব্যস্ত না করে প্রমাণের ভিত্তিতেই দায় নির্ধারণ করতে হবে। ঠিকাদার প্রভাবশালী হোন কিংবা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা, কারও জন্যই জবাবদিহি এড়ানোর সুযোগ থাকা উচিত নয়।

শিশুদের খাবার কোনো সাধারণ পণ্য নয়

স্কুল ফিডিং কর্মসূচিতে বর্তমানে সপ্তাহে পাঁচ দিন বনরুটি, কেক, সিদ্ধ ডিম, প্যাকেটজাত দুধ ও কলার মতো খাবার দেওয়া হচ্ছে। এসব খাবারের অনেকগুলোই দ্রুত নষ্ট হওয়ার ঝুঁকিতে থাকে। বিশেষ করে গরম আবহাওয়ায় যথাযথ তাপমাত্রা ও স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশে সংরক্ষণ না করলে খাবার অল্প সময়ের মধ্যেই খাওয়ার অনুপযোগী হয়ে যেতে পারে।

তাই খাবার সরবরাহের ক্ষেত্রে শুধু পরিমাণ ও দাম বিবেচনা করলে চলবে না। খাবারের পুষ্টিমান, নিরাপত্তা, উৎপাদন ও মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখ, পরিবহন এবং সংরক্ষণব্যবস্থাকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে। প্রতিটি বিদ্যালয়ে খাবার গ্রহণের আগে তা পরীক্ষা করার ব্যবস্থা থাকতে হবে। প্রয়োজনে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে নিয়মিত নমুনা সংগ্রহ ও পরীক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে।

শিক্ষার্থীদের খাবার সরবরাহের দায়িত্ব যাঁদের দেওয়া হচ্ছে, তাঁদের যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা, পূর্ববর্তী কাজের মান এবং আর্থিক স্বচ্ছতাও যাচাই করা প্রয়োজন। শুধু কম দামে দরপত্র দেওয়ার ভিত্তিতে ঠিকাদার নির্বাচন করলে চলবে না। শিশুদের স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার সক্ষমতাই হতে হবে ঠিকাদার নির্বাচনের প্রধান শর্ত।

প্রকল্পের সাফল্য যেন অব্যবস্থাপনায় নষ্ট না হয়

প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দুপুরের খাবার সরবরাহের উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের আওতায় আটটি বিভাগের ১৫০টি উপজেলার ১৯ হাজার ৪১৯টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রায় ৩১ লাখ ৩০ হাজার শিক্ষার্থীকে খাবার দেওয়ার পরিকল্পনা ও কার্যক্রম রয়েছে। এ উদ্যোগের মাধ্যমে বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি বাড়ানো, অপুষ্টি কমানো এবং শিক্ষার পরিবেশ উন্নত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

ভবিষ্যতে দেশের সব সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এ কর্মসূচি সম্প্রসারণের পরিকল্পনাও রয়েছে। কিন্তু বর্তমান ব্যবস্থাপনায় যদি খাবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা না যায়, তাহলে পরিসর বাড়ানোর আগে বিদ্যমান সমস্যাগুলোর সমাধান করা জরুরি। কারণ, একটি ভালো উদ্যোগও যথাযথ তদারকি ও জবাবদিহির অভাবে জনস্বার্থবিরোধী হয়ে উঠতে পারে।

প্রকল্পের সাফল্য শুধু কতজন শিক্ষার্থী খাবার পেল, সেই হিসাব দিয়ে বিচার করা যাবে না। খাবার খেয়ে তারা সুস্থ থাকছে কি না, প্রয়োজনীয় পুষ্টি পাচ্ছে কি না এবং খাবারের মান নিয়ে অভিভাবকদের আস্থা তৈরি হচ্ছে কি না, সেগুলোও মূল্যায়নের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

তদন্তের পাশাপাশি দৃশ্যমান ব্যবস্থা চাই

শিক্ষার্থীদের অসুস্থ হওয়ার প্রতিটি ঘটনা গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করতে হবে। খাবারের নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষাগারে পরীক্ষা, সরবরাহের নথি যাচাই, সংরক্ষণ ও পরিবহনব্যবস্থা পরিদর্শন এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে প্রকৃত কারণ বের করতে হবে।

তদন্তে কোনো ঠিকাদারের বিরুদ্ধে নিম্নমানের বা পচা খাবার সরবরাহের প্রমাণ পাওয়া গেলে তার চুক্তি বাতিল, আর্থিক জরিমানা এবং প্রচলিত আইন অনুযায়ী শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। একই সঙ্গে দায়িত্বে অবহেলা কিংবা অনিয়মে সংশ্লিষ্ট কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীর সম্পৃক্ততা পাওয়া গেলে তাঁদের বিরুদ্ধেও বিভাগীয় ও আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে। শুধু তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন তৈরি করে ফাইলবন্দী করে রাখলে চলবে না। তদন্তের সুপারিশ বাস্তবায়ন করতে হবে এবং অভিভাবক ও সাধারণ মানুষকে ফলাফল জানাতে হবে।

প্রতিটি বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক, অভিভাবক প্রতিনিধি ও বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সদস্যদের নিয়ে খাবারের মান যাচাইয়ের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। খাবার গ্রহণের সময় তারিখ, পরিমাণ ও গুণগত মানের তথ্য সংরক্ষণ করতে হবে। কোথাও খাবারের মান নিয়ে সন্দেহ দেখা দিলে তা শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিতরণ বন্ধ রাখতে হবে। অভিযোগ জানানোর জন্য সহজ ও কার্যকর ব্যবস্থাও থাকা প্রয়োজন।

শিশুদের নিরাপত্তাই হোক সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার

মনে রাখতে হবে, স্কুল ফিডিং কর্মসূচি কোনো ঠিকাদারের ব্যবসা সম্প্রসারণের প্রকল্প নয়। এটি শিশুদের পুষ্টি, স্বাস্থ্য ও শিক্ষার সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত একটি রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব। এখানে অনিয়মের অর্থ শুধু সরকারি অর্থের অপচয় নয়, শিশুদের জীবন ও স্বাস্থ্যের ঝুঁকি তৈরি করা।

একটি শিশুর অসুস্থ হয়ে পড়া মানে একটি পরিবারের উদ্বেগ, একটি বিদ্যালয়ের আতঙ্ক এবং রাষ্ট্রের দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার প্রশ্ন। তাই এ ধরনের ঘটনা ঘটার পর সাময়িক তৎপরতা দেখিয়ে আবার আগের অবস্থায় ফিরে যাওয়ার সুযোগ নেই।

সরকারের উচিত স্কুল ফিডিং কর্মসূচির প্রতিটি ধাপে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা। ঠিকাদার নির্বাচন থেকে শুরু করে খাবার তৈরি, সংরক্ষণ, পরিবহন ও বিদ্যালয়ে বিতরণ পর্যন্ত প্রতিটি পর্যায়ে কঠোর নজরদারি থাকতে হবে। প্রয়োজনে স্বাধীন পর্যবেক্ষণব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যাতে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান কিংবা দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা নিজেদের ইচ্ছামতো সিদ্ধান্ত নিতে না পারেন।

আমরা মনে করি, প্রাথমিক শিক্ষার্থীদের জন্য দুপুরের খাবার কর্মসূচি বন্ধ করা নয়, বরং এর ব্যবস্থাপনা ও তদারকি আরও শক্তিশালী করাই এখন সবচেয়ে জরুরি। কারণ, এই কর্মসূচির মূল উদ্দেশ্য শিশুদের সুস্থ রাখা, তাদের শিক্ষায় আগ্রহী করে তোলা এবং ভবিষ্যতের জন্য একটি পুষ্ট ও শিক্ষিত প্রজন্ম গড়ে তোলা।

শিশুদের মুখে খাবার তুলে দেওয়ার নামে তাদের স্বাস্থ্যের ঝুঁকিতে ফেলা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। বাসি ও পচা খাবার সরবরাহের সঙ্গে জড়িত প্রত্যেককে জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। ঠিকাদার হোক কিংবা সরকারি কর্মকর্তা, অপরাধ প্রমাণিত হলে কাউকেই ছাড় দেওয়া যাবে না। শিশুদের নিরাপদ খাবার নিশ্চিত করতে সরকারকে শুধু নজরদারি বাড়ালেই হবে না, সেই নজরদারির বাস্তব প্রয়োগও নিশ্চিত করতে হবে। শিশুদের স্বাস্থ্য নিয়ে কোনো আপস নয়, স্কুল ফিডিং কর্মসূচিতে চাই শূন্য সহনশীলতা।
মূল লেখা : https://www.newsbangla.news/details/5065