নিজস্ব প্রতিবেদক
খায়রুল আলম (সুমন) :
একটি রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক ভিত্তি কতটা শক্তিশালী, তার অন্যতম মাপকাঠি হলো—সেই রাষ্ট্রের সাংবাদিকতা কতটা স্বাধীন, দায়িত্বশীল ও বস্তুনিষ্ঠ এবং প্রশাসন কতটা জনবান্ধব, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক। সাংবাদিকতা মানুষের কথা বলার জায়গা তৈরি করে, আর প্রশাসন রাষ্ট্রের আইন, নীতি ও সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের মাধ্যমে নাগরিকের অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করে। এই দুই প্রতিষ্ঠান যখন নিজ নিজ দায়িত্বে অবিচল থাকে, তখন রাষ্ট্রে সুশাসনের ভিত শক্ত হয়। বিপরীতে কোথাও সততা, নিষ্ঠা ও দায়িত্ববোধের ঘাটতি দেখা দিলে তার প্রভাব পড়ে পুরো সমাজে।
সাংবাদিকতার সবচেয়ে বড় শক্তি তার বিশ্বাসযোগ্যতা। একজন সাংবাদিকের হাতে থাকা কলম নিছক সংবাদ প্রকাশের মাধ্যম নয়, এটি জনস্বার্থ রক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার। সেই কলম যখন সত্যকে তুলে ধরে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রশ্ন করে এবং নিপীড়িত মানুষের কণ্ঠস্বর হয়ে ওঠে, তখন সাংবাদিকতা তার প্রকৃত দায়িত্ব পালন করে। কিন্তু সংবাদ যদি তথ্য যাচাই ছাড়াই প্রকাশিত হয়, ব্যক্তিস্বার্থ বা প্রভাবশালী মহলের চাপের কাছে সত্য বিসর্জিত হয় কিংবা উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে কাউকে হেয় করার হাতিয়ার হিসেবে গণমাধ্যম ব্যবহৃত হয়, তাহলে ক্ষতিগ্রস্ত হয় শুধু একজন ব্যক্তি নয়—ক্ষতিগ্রস্ত হয় সাংবাদিকতার প্রতি মানুষের আস্থা।
আজকের তথ্যপ্রযুক্তির যুগে এই দায়িত্ব আরও বেড়েছে। একটি সংবাদ প্রকাশের কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই তা হাজার হাজার মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। ভুল তথ্য, গুজব কিংবা অসম্পূর্ণ সংবাদ তাই মুহূর্তেই সামাজিক উত্তেজনা তৈরি করতে পারে। এ কারণে সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে ‘আগে প্রকাশ, পরে যাচাই’ নয়; বরং ‘আগে যাচাই, তারপর প্রকাশ’—এই নীতিই হওয়া উচিত পেশাগত আদর্শ। দ্রুততার সঙ্গে নির্ভুলতার সমন্বয় করাই আধুনিক সাংবাদিকতার বড় চ্যালেঞ্জ।
একইভাবে প্রশাসনের ক্ষেত্রেও জনগণের আস্থা সবচেয়ে বড় সম্পদ। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা জনগণের কল্যাণে ব্যবহৃত হলে প্রশাসন হয়ে ওঠে মানুষের আশ্রয়ের জায়গা। আর ক্ষমতার অপব্যবহার, বৈষম্য, অহেতুক হয়রানি কিংবা অনিয়মের অভিযোগ প্রশাসনের প্রতি মানুষের আস্থাকে দুর্বল করে। একজন সাধারণ নাগরিক যখন কোনো সরকারি দপ্তরে সেবা নিতে যান, তখন তিনি যেন নিজেকে অসহায় মনে না করেন—এটাই হওয়া উচিত জনবান্ধব প্রশাসনের মূল দর্শন।
প্রশাসনের প্রতিটি সিদ্ধান্তে আইন, ন্যায় ও জনস্বার্থকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। অপরাধী যত প্রভাবশালীই হোক, আইনের আওতায় আনতে হবে; আবার কোনো নিরপরাধ মানুষ যেন কেবল অভিযোগের ভিত্তিতে সামাজিকভাবে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত না হন, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে। আইনের শাসনের সৌন্দর্য এখানেই—আইন সবার জন্য সমান এবং অভিযোগ ও অপরাধ প্রমাণিত হওয়ার মধ্যে সুস্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে।
এখানেই সাংবাদিকতা ও প্রশাসনের দায়িত্বশীলতার একটি গুরুত্বপূর্ণ যোগসূত্র তৈরি হয়। সাংবাদিক অনিয়মের তথ্য তুলে ধরবেন, প্রশাসন তা যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে। সাংবাদিক প্রশ্ন করবেন, প্রশাসন তথ্য দিয়ে জবাব দেবে। সাংবাদিকের কাজ প্রশাসনের সমালোচনা করা হতে পারে, কিন্তু সেই সমালোচনা হতে হবে তথ্যনির্ভর; আবার প্রশাসনের কাজ সাংবাদিকের প্রশ্নকে শত্রুতা হিসেবে দেখা নয়, বরং প্রয়োজনীয় জবাবদিহির অংশ হিসেবে গ্রহণ করা।
তবে সাংবাদিকতা ও প্রশাসনের পারস্পরিক সম্পর্ক কখনোই অস্বচ্ছ সমঝোতায় পরিণত হওয়া উচিত নয়। সাংবাদিকের স্বাধীনতা যেমন রক্ষা করতে হবে, তেমনি সাংবাদিকতার নামে দায়িত্বহীনতা, মিথ্যা তথ্য বা ব্যক্তিগত স্বার্থসিদ্ধির প্রবণতাকেও প্রশ্রয় দেওয়া যাবে না। একইভাবে প্রশাসনের কর্মকর্তাদেরও গণমাধ্যমকে ভয় কিংবা প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখার মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। গণমাধ্যম ও প্রশাসন একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়; বরং জনস্বার্থে ভিন্ন ভিন্ন দায়িত্ব পালনকারী দুটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান।
একটি সুস্থ সমাজে সাংবাদিকতা হবে বিবেকের কণ্ঠস্বর এবং প্রশাসন হবে ন্যায় ও সেবার প্রতীক। সাংবাদিক যখন দুর্নীতি, অনিয়ম, মাদক, চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস, জনদুর্ভোগ কিংবা রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপব্যবহারের তথ্য সামনে আনেন, তখন তিনি শুধু একটি সংবাদ প্রকাশ করেন না—সমাজের অসঙ্গতির দিকে রাষ্ট্রের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। প্রশাসন সেই তথ্যকে গুরুত্ব দিয়ে নিরপেক্ষভাবে তদন্ত ও আইনানুগ ব্যবস্থা নিলে সাংবাদিকতার ইতিবাচক ভূমিকা আরও শক্তিশালী হয়।
অন্যদিকে প্রশাসনেরও দায়িত্ব রয়েছে জনগণের কাছে সঠিক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার। তথ্যের ঘাটতি যেখানে থাকে, সেখানে গুজব ও অপতথি জায়গা করে নেয়। তাই সংকটের সময়ে দ্রুত ও নির্ভুল তথ্য প্রদান, নিয়মিত গণমাধ্যমকে অবহিত করা এবং জনসাধারণের প্রশ্নের জবাব দেওয়া প্রশাসনের দায়িত্বশীলতারই অংশ।
আমাদের মনে রাখতে হবে, একটি রাষ্ট্র কেবল আইন দিয়ে পরিচালিত হয় না; রাষ্ট্র পরিচালিত হয় মানুষের আস্থা দিয়ে। সেই আস্থা অর্জন করা কঠিন, কিন্তু হারানো খুব সহজ। একটি ভুল সংবাদ যেমন সাংবাদিকতার বিশ্বাসযোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে, তেমনি একটি অন্যায় সিদ্ধান্ত প্রশাসনের প্রতি মানুষের দীর্ঘদিনের আস্থা নষ্ট করে দিতে পারে। তাই উভয় ক্ষেত্রেই প্রয়োজন আত্মসংযম, পেশাদারিত্ব ও নৈতিক দৃঢ়তা।
সাংবাদিকের কাছে সবচেয়ে বড় পরিচয় হওয়া উচিত—তিনি সত্যের অনুসন্ধানী। প্রশাসনের কাছে সবচেয়ে বড় পরিচয় হওয়া উচিত—তিনি জনগণের সেবক। পদ, ক্ষমতা, পরিচিতি কিংবা প্রভাব কোনো কিছুই এই মৌলিক দায়িত্বের ঊর্ধ্বে হতে পারে না।
আজ আমাদের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন এমন সাংবাদিকতা, যে সাংবাদিকতা ভয়কে ভয় পাবে না, আবার দায়িত্বহীনতাকেও স্বাধীনতার নামে বৈধতা দেবে না। প্রয়োজন এমন প্রশাসন, যে প্রশাসন ক্ষমতার দম্ভ নয়, আইনের শক্তি ও মানবিকতার সমন্বয়ে জনগণের পাশে দাঁড়াবে।
সাংবাদিকতা ও প্রশাসন—দুই পক্ষই যদি নিজেদের দায়িত্বের জায়গায় সততা, নিষ্ঠা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে পারে, তাহলে শুধু প্রতিষ্ঠান নয়, উপকৃত হবে পুরো দেশ। কমবে অনিয়ম, শক্তিশালী হবে আইনের শাসন, বাড়বে জনআস্থা এবং তৈরি হবে নাগরিকবান্ধব রাষ্ট্রব্যবস্থার ভিত্তি।
কারণ সাংবাদিকতার শক্তি তার সত্যে, প্রশাসনের শক্তি তার ন্যায়বোধে, আর রাষ্ট্রের শক্তি নিহিত জনগণের আস্থায়। সেই আস্থা রক্ষার প্রথম শর্ত—সততা, নিষ্ঠা ও দায়িত্ববোধ।