নিজস্ব প্রতিবেদক
আন্তর্জাতিক ডেস্ক :
ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাতের প্রভাব এবার সরাসরি পড়ছে মার্কিন নাগরিকদের জীবনযাত্রা ও পকেটে। যুক্তরাষ্ট্রে ডিজেলের গড় দাম উঠে গেছে সর্বকালের সর্বোচ্চ পর্যায়ে। জ্বালানির এই মূল্যবৃদ্ধির কারণে দেশটির পরিবহন, কৃষি, নির্মাণসহ বিভিন্ন বাণিজ্যিক খাতে ব্যয় বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রে ট্রাক, ট্রেন, নৌযান ও বাসের পাশাপাশি কৃষি ও নির্মাণকাজে ব্যবহৃত বিভিন্ন যানবাহনে ব্যাপকভাবে ডিজেল ব্যবহার করা হয়। ফলে ডিজেলের দাম বাড়লে শুধু ব্যক্তিগত পরিবহন নয়, পণ্য পরিবহন ও সরবরাহ ব্যবস্থার খরচও বেড়ে যেতে পারে। এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত বিভিন্ন পণ্য ও সেবার দামেও পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
আমেরিকান অটোমোবাইল অ্যাসোসিয়েশন (এএএ)-এর তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে বর্তমানে প্রতি গ্যালন ডিজেলের গড় দাম ৫ দশমিক ৮৫ ডলার। এক বছর আগে একই পরিমাণ ডিজেলের গড় দাম ছিল ৩ দশমিক ৭১ ডলার। এমনকি ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযান শুরুর পর ডিজেলের যে সর্বোচ্চ দাম উঠেছিল, বর্তমান মূল্য সেটিকেও ছাড়িয়ে গেছে।
ইরানের সঙ্গে সংঘাত শুরু হওয়ার পর গত ফেব্রুয়ারির শেষ দিক থেকেই যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানির দাম দ্রুত বাড়তে শুরু করে। আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের পাইকারি দাম বেড়ে যাওয়াকে এর অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বিশ্ববাজারে তেলের দাম বাড়ার পেছনে হরমুজ প্রণালীর সংকটও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। ইরানের দক্ষিণে অবস্থিত এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ দিয়ে বিশ্বের মোট তেল পরিবহনের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ যায়। যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেল সরবরাহ নিয়ে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে খুচরা জ্বালানির বাজারেও।
জ্বালানির বাড়তি দামের চাপ কমাতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি সব আমেরিকানের জন্য গ্যাসের দাম ‘উল্লেখযোগ্যভাবে কমানোর’ প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। এ লক্ষ্যেই ভেনেজুয়েলার সঙ্গে একটি তেল চুক্তির কথা জানিয়েছেন তিনি।
শনিবার ঘোষিত সর্বশেষ চুক্তি অনুযায়ী, ভেনেজুয়েলায় প্রমাণিতভাবে প্রায় ৬৫ বিলিয়ন ব্যারেল তেল মজুতের সম্ভাবনা থাকা ১৭টি কৌশলগত তেলক্ষেত্র উন্নয়নের পরিকল্পনা রয়েছে। ভেনেজুয়েলার অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ জানিয়েছেন, এই প্রকল্পে ১০০ বিলিয়ন ডলারের বেশি বিনিয়োগ এবং ২০৯ বিলিয়ন ডলারের বেশি কর আদায়ের সম্ভাবনা রয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মার্কিন কর্মকর্তা সিবিএস নিউজকে জানিয়েছেন, ভেনেজুয়েলার একটি অভিজ্ঞ বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে যুক্তরাষ্ট্র এই প্রকল্পে ৫৫ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখবে।
তবে নতুন এই চুক্তি নিয়ে সংশয়ও রয়েছে। বিশ্লেষকদের কেউ কেউ প্রশ্ন তুলেছেন, ভেনেজুয়েলার তেল খাতে দীর্ঘদিন ধরে বিনিয়োগের পথে থাকা বিভিন্ন বাধা নতুন চুক্তির মাধ্যমে কতটা দূর করা সম্ভব হবে। ফলে এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি বাজারে দ্রুত স্বস্তি ফিরবে কি না, তা নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে।
এদিকে জ্বালানির দাম বাড়তে থাকায় মার্কিন ভোটারদের মধ্যেও অসন্তোষ বাড়ছে। আগামী নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রে গুরুত্বপূর্ণ মধ্যবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। নির্বাচনের আগে জ্বালানি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের জন্য রাজনৈতিক চাপ আরও বাড়াতে পারে।
রয়টার্সের সাম্প্রতিক এক জনমত জরিপ অনুযায়ী, ট্রাম্পের প্রতি অনুমোদনের হার নেমে দাঁড়িয়েছে ৩৩ শতাংশে। অন্যদিকে ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাতকে সমর্থন করছেন মাত্র ৩১ শতাংশ মার্কিন নাগরিক।
অবশ্য যুক্তরাষ্ট্রের সব অঙ্গরাজ্যে জ্বালানির দাম একই হারে বাড়েনি। মার্কিন সরকারের তথ্য অনুযায়ী, করের পার্থক্য এবং দেশটির তেল উৎপাদন কেন্দ্রগুলো থেকে দূরত্বের কারণে পশ্চিমাঞ্চলীয় অঙ্গরাজ্যগুলোতে ডিজেলের দাম তুলনামূলক বেশি।
এর মধ্যে ওয়াশিংটন অঙ্গরাজ্যে প্রতি গ্যালন ডিজেলের গড় দাম দাঁড়িয়েছে ৬ দশমিক ৮১ ডলার। এক বছর আগে সেখানে এই দাম ছিল ৫ দশমিক ৩০ ডলার।
শুধু ডিজেল নয়, যুক্তরাষ্ট্রে পেট্রোলের দামও ঐতিহাসিকভাবে উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। বর্তমানে দেশটিতে প্রতি গ্যালন পেট্রোলের গড় দাম ৪ দশমিক ১৫ ডলার, যা এক বছর আগে ছিল ৩ দশমিক ২০ ডলার।
ফলে ইরান সংঘাত, হরমুজ প্রণালীর অস্থিরতা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা একদিকে যেমন মার্কিন ভোক্তাদের ব্যয় বাড়াচ্ছে, অন্যদিকে তেমনি পরিবহন ও ব্যবসায়িক খাতেও বাড়াচ্ছে চাপ। জ্বালানির দাম দ্রুত কমানো না গেলে এর অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রভাব আরও বিস্তৃত হতে পারে।