নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক :
নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে স্বস্তি ফেরানোর নানা উদ্যোগের মধ্যেই নতুন করে ভোক্তার ওপর চাপ বাড়িয়েছে ভোজ্যতেলের দাম। বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে ভোজ্যতেল ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠকের পর বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম লিটারে ৫ টাকা বাড়িয়ে ২০৪ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। আগে এই তেল বিক্রি হতো ১৯৯ টাকা লিটার দরে। একই সঙ্গে ৫ লিটারের বোতলের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ৯৭৫ টাকা এবং খোলা সয়াবিন তেলের দাম ১৭৬ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৮০ টাকা করা হয়েছে। পামওয়েলের দাম অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে।
ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে সয়াবিন তেলের দাম লিটারে ১০ টাকা বাড়ানোর আবেদন করা হয়েছিল। তবে আলোচনার পর বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ৫ টাকা বাড়ানোর অনুমোদন দিয়েছে। বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বৈঠক শেষে নতুন দাম জানান। ব্যবসায়ীরা আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধি, আমদানি ব্যয় ও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধির বিষয়টি তুলে ধরে মূল্য সমন্বয়ের দাবি জানিয়েছিলেন।
তিন দিনে বাজারের চিত্র
গত ৩১ আগস্ট রাজধানীর খুচরা বাজারের চিত্রে দেখা যায়, দীর্ঘদিন ধরেই চাল, ডাল, আলু, পেঁয়াজ ও সবজির দামে ভোক্তাদের চাপ রয়েছে। এক সপ্তাহের ব্যবধানে মোটা চালের দাম কেজিতে ২ থেকে ৩ টাকা, মসুর ডালের দাম ৫ থেকে ১০ টাকা এবং আলুর দাম কেজিতে প্রায় ৫ টাকা বেড়েছিল।
ওই সময় মোটা মসুর ডাল বিক্রি হয়েছে ৯৫ থেকে ১০৫ টাকা, মাঝারি মানের মসুর ডাল ১১৫ থেকে ১২০ টাকা এবং সরু দানার মসুর ডাল ১৩৫ থেকে ১৪৫ টাকা কেজি দরে। ব্রয়লার মুরগি ছিল ১৭০ থেকে ১৮০ টাকা, সোনালি মুরগি ৩০০ থেকে ৩২০ টাকা এবং গরুর মাংস প্রায় ৮০০ টাকা কেজি।
সবজির বাজারেও খুব একটা স্বস্তি ছিল না। পটল, ঝিঙা, বরবটি, শসা, কচুরমুখী ও করলার মতো সবজির অনেকগুলোই ৭০ থেকে ৯০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়েছে। শসা ছিল ৬০ থেকে ৭০ টাকা, মূলা প্রায় ৬০ টাকা, ধুন্দল ও ঢেঁড়স প্রায় ৮০ টাকা এবং চিচিঙ্গা প্রায় ৬০ টাকা কেজি।
অন্যদিকে ১ সেপ্টেম্বর দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের বাজারে কিছুটা ভিন্ন চিত্র দেখা গেছে। রংপুরে কাঁচামরিচের দাম এক সপ্তাহের ব্যবধানে ৮০-১০০ টাকা থেকে কমে ৫০-৬০ টাকা কেজিতে নেমেছে। ডিম ও পোলট্রি মুরগির দামও কিছুটা কমেছে। তবে চাল, ডাল, মাছ ও মাংসের দাম ছিল মোটামুটি অপরিবর্তিত।
চিনি ও তেল নিয়ে নতুন উদ্বেগ
বাজারে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছে চিনি ও ভোজ্যতেল। রাজধানীর কয়েকটি বাজারের ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, চিনি সরবরাহ কমে গেছে। কোথাও কোথাও কোম্পানির বিক্রয় প্রতিনিধিদের নিয়মিত না আসায় বাজারে চিনি পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। খোলা চিনি পাওয়া গেলেও দাম বেশি। অনেক দোকানে প্রতি কেজি চিনি ১২০ টাকার নিচে বিক্রি করা সম্ভব হচ্ছে না বলে ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন।
একই সঙ্গে সয়াবিন তেলের সরবরাহ নিয়েও ব্যবসায়ীদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এর মধ্যেই বুধবার বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের বৈঠকে তেলের দাম সমন্বয় করে বাড়ানোর সিদ্ধান্ত এসেছে। ফলে বাজারে এর প্রভাব কতটা পড়ে, সেটিই এখন ভোক্তাদের বড় প্রশ্ন।
চাল-ডালে কিছুটা স্বস্তি, তবে বাজার পুরোপুরি স্থিতিশীল নয়
সাম্প্রতিক সময়ে চালের বাজারে সরবরাহ বাড়ানোর উদ্যোগের কারণে কিছুটা স্বস্তির খবর পাওয়া গেছে। তবে সব ধরনের চালের দাম একই হারে কমেনি। রাজধানীর বাজারে মাঝারি চাল, মোটা চাল, আটা, ময়দা ও মসুর ডালের দামে এখনো উল্লেখযোগ্য পার্থক্য রয়েছে।
একটি বাজারদর তালিকায় মাঝারি চাল ৫৫ থেকে ৬৫ টাকা, মোটা চাল ৫০ থেকে ৫৫ টাকা, খোলা আটা ৪৮ থেকে ৫০ টাকা, প্যাকেট আটা ৬০ থেকে ৬৫ টাকা, খোলা ময়দা ৬৫ থেকে ৭০ টাকা এবং বড় দানার মসুর ডাল ৯০ থেকে ১০০ টাকা কেজি দরে দেখানো হয়েছে। বাজার, মান ও বিক্রয়স্থলভেদে এসব দামে পার্থক্য রয়েছে।
সরকারের নজরে বাজার, টিসিবির বড় কেনাকাটা
নিত্যপণ্যের বাজার স্থিতিশীল রাখতে সরকারও একাধিক পদক্ষেপ নিচ্ছে। ২ সেপ্টেম্বর সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে টিসিবির জন্য ২ কোটি লিটার পরিশোধিত পাম অলিন ও ১০ হাজার মেট্রিক টন মসুর ডাল কেনার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এতে সরকারের মোট ব্যয় হবে ৪৪৫ কোটি ৬০ লাখ টাকা।
মসুর ডাল কেনা হবে প্রতি কেজি ৭৭ টাকা ৯০ পয়সা দরে। এসব পণ্য টিসিবির কার্ডধারী নিম্ন আয়ের প্রায় এক কোটি পরিবারের মধ্যে ভর্তুকি মূল্যে বিক্রি করা হবে। সরকারের এ উদ্যোগ বাজারে সরবরাহ বাড়ানোর পাশাপাশি নিম্ন আয়ের মানুষের ওপর মূল্যস্ফীতির চাপ কমাতে সহায়ক হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
এ ছাড়া চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাজার স্থিতিশীল রাখতে প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকার নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কেনার পরিকল্পনা করেছে টিসিবি। এর আওতায় ভোজ্যতেল, মসুর ডাল, চিনি, ছোলা ও খেজুরসহ বিভিন্ন পণ্য কেনার কথা রয়েছে।
বাজার নিয়ে ব্যবসায়ীদের বার্তা
১ সেপ্টেম্বর ব্যবসায়ী ও আমদানিকারকদের সঙ্গে আলোচনায় উঠে এসেছে, সরবরাহ স্বাভাবিক থাকলে নিত্যপণ্যের দাম বাড়ার সুযোগ নেই। তবে জ্বালানি সংকট, আমদানি ও এলসি সংক্রান্ত জটিলতা, উৎপাদন ব্যাহত হওয়া এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য বাজারে অস্থিরতার কারণ হতে পারে বলে ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন।
ব্যবসায়ী প্রতিনিধিরা বিশেষ করে চিনি, ভোজ্যতেল, ডাল, আটা ও ময়দার পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তারা বলেছেন, উৎপাদন ও আমদানি সচল থাকলে বাজারে অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধির সুযোগ কমে আসবে। একই সঙ্গে মিলগেট, পাইকারি ও খুচরা পর্যায়ে মূল্য তদারকি আরও জোরদারের দাবি জানিয়েছেন তারা।
এদিকে পে-স্কেল ঘোষণার পর সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বৃদ্ধিকে অজুহাত করে যাতে কেউ নিত্যপণ্যের দাম বাড়াতে না পারে, সে বিষয়ে ব্যবসায়ীদের সতর্ক করেছে এফবিসিসিআই। সংগঠনটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বেতন বৃদ্ধির সঙ্গে নিত্যপণ্যের দাম বাড়ানোর সরাসরি কোনো যৌক্তিক সম্পর্ক নেই।
বাজার নজরদারিতে নতুন প্রযুক্তির পরিকল্পনা
বাজার পরিস্থিতি আগেভাগে বুঝতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক বাজার গোয়েন্দা ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনাও করছে টিসিবি। প্রস্তাবিত এই ব্যবস্থায় বৃষ্টিপাত, পরিবহন, উৎপাদন, আমদানি, পণ্যের দাম ও সরবরাহ প্রবাহের তথ্য বিশ্লেষণ করে সম্ভাব্য সংকটের আগাম সতর্কবার্তা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
এ উদ্যোগে টিসিবির পাশাপাশি বাণিজ্য, খাদ্য ও কৃষি মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিনিধিদের সম্পৃক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
ভোক্তার প্রশ্ন একটাই
সরকারের নানা উদ্যোগ, আমদানিতে শুল্ক-কর ছাড়, টিসিবির ভর্তুকি মূল্যে পণ্য বিক্রি এবং বাজার মনিটরিংয়ের পরও সাধারণ মানুষের বাজার খরচে কাঙ্ক্ষিত স্বস্তি পুরোপুরি ফেরেনি। গত তিন দিনে কিছু পণ্যের দাম কমলেও অন্যদিকে সবজি, ডাল, চিনি ও তেলের বাজারে চাপ রয়েছে।
সবচেয়ে বড় উদ্বেগ তৈরি হয়েছে আজকের সয়াবিন তেলের দাম বৃদ্ধিকে ঘিরে। একদিকে বাজার স্থিতিশীল রাখার উদ্যোগ, অন্যদিকে গুরুত্বপূর্ণ একটি নিত্যপণ্যের সরকারি মূল্য বৃদ্ধি। ফলে আগামী কয়েক দিনে অন্যান্য পণ্যের বাজারে এর প্রভাব পড়ে কি না, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
ভোক্তাদের প্রত্যাশা, শুধু দাম নির্ধারণ নয়, নির্ধারিত দামে পণ্য বিক্রি হচ্ছে কি না, সরবরাহ ঠিক আছে কি না এবং কোনো পর্যায়ে কৃত্রিম সংকট তৈরি হচ্ছে কি না, সেদিকেও কঠোর নজরদারি থাকবে। কারণ বাজারে পণ্যের সরবরাহ স্বাভাবিক থাকলেও যদি মধ্যস্বত্বভোগী বা অসাধু ব্যবসায়ীদের কারণে দাম বেড়ে যায়, তাহলে সরকারের নেওয়া বিভিন্ন উদ্যোগের সুফল সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাবে না।