নিজস্ব প্রতিবেদক
আন্তর্জাতিক ডেস্ক :
ইসরায়েলি বিমান হামলায় ধ্বংস হয়ে যাওয়া গাজার একটি আবাসিক ভবনের ধ্বংসস্তূপের নিচে প্রায় দুই বছর চাপা পড়ে থাকা ১১২ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। নিহতদের মধ্যে রয়েছে অন্তত ৪০ শিশু। মঙ্গলবার (৫ আগস্ট) ফিলিস্তিনি পরিবারগুলো উদ্ধার হওয়া মরদেহগুলোর জানাজা শেষে দাফন সম্পন্ন করে।
জানা গেছে, ২০২৩ সালের নভেম্বরে গাজা সিটির একটি আবাসিক এলাকায় ইসরায়েলি বিমান হামলায় ভবনটি সম্পূর্ণ ধসে পড়ে। দীর্ঘ সময় উদ্ধার কার্যক্রম ব্যাহত থাকায় মরদেহগুলো ধ্বংসস্তূপের নিচেই চাপা পড়ে ছিল। স্থানীয় সূত্রের দাবি, একই স্থানে এখনও অন্তত ১৫৭ জনের মরদেহ চাপা পড়ে থাকতে পারে।
চলমান যুদ্ধের মধ্যে এটি গাজায় অন্যতম বৃহৎ গণদাফনের ঘটনা। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর ইসরায়েলের সামরিক অভিযান শুরু হলে গাজাজুড়ে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ ও প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে থাকা মরদেহ উদ্ধারের ঘটনা অত্যন্ত সীমিত ছিল।
সেভ দ্য চিলড্রেন-এর মধ্যপ্রাচ্য, উত্তর আফ্রিকা ও পূর্ব ইউরোপ অঞ্চলের পরিচালক আহমাদ আলহেন্দাওয়ি বলেন, গাজার পরিবারগুলো দীর্ঘদিন পর স্বজনদের দাফনের সুযোগ পেলেও এটি অত্যন্ত বেদনাদায়ক বাস্তবতা। তিনি অভিযোগ করেন, উদ্ধার ও অনুসন্ধানকারী দলের প্রবেশ, ভারী যন্ত্রপাতি এবং ফরেনসিক সহায়তায় বিভিন্ন বিধিনিষেধ থাকায় মরদেহ উদ্ধারে দীর্ঘ বিলম্ব হয়েছে।
তিনি অবিলম্বে এসব বাধা প্রত্যাহার এবং গাজায় বিমান হামলা বন্ধের আহ্বান জানান।
এদিকে গাজার স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে এখন পর্যন্ত অন্তত ২১ হাজার শিশু নিহত হয়েছে। জাতিসংঘের তথ্য বলছে, আহত হয়েছে ৪৪ হাজারের বেশি শিশু। তাদের অনেকেই স্থায়ী প্রতিবন্ধকতা, গুরুতর শারীরিক ও মানসিক আঘাত নিয়ে বেঁচে আছে।
জাতিসংঘের একটি স্বাধীন তদন্ত কমিশন সম্প্রতি প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানিয়েছে, গাজার শিশুদের ওপর যুদ্ধের প্রভাব ভয়াবহ। গুরুতর শারীরিক ও মানসিক আঘাত, পরিবার হারানো, বাস্তুচ্যুতি, অনাহার, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যব্যবস্থার ধ্বংস এবং নিরাপত্তাহীনতা একটি পুরো প্রজন্মের শৈশবকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে।
গাজার বাসিন্দা ও চার সন্তানের মা মাইশা ইউসুফ বলেন, যুদ্ধ শুধু মানুষের প্রাণই কেড়ে নেয়নি, শিশুদের স্বাভাবিক জীবনও ধ্বংস করে দিয়েছে। তার ভাষায়, "আমার সন্তানরা তাদের বন্ধু, শিক্ষক এবং পরিচিত মানুষদের একে একে হারিয়েছে। তাদের পুরো সামাজিক জগতটাই ভেঙে পড়েছে।"
তিনি আরও বলেন, এখানে প্রতিদিনই মৃতের সংখ্যা বাড়ছে। আমরা সংখ্যায় পরিণত হয়েছি, অথচ এই মৃত্যুর জন্য কেউ জবাবদিহি করছে না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘস্থায়ী এই যুদ্ধ শুধু অবকাঠামো নয়, গাজার শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও ভবিষ্যতের ওপরও গভীর প্রভাব ফেলছে। এখনও শত শত ধ্বংসস্তূপের নিচে বহু মরদেহ চাপা পড়ে রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে, যা যুদ্ধের ভয়াবহ মানবিক সংকটকে আরও স্পষ্ট করে তুলছে।