ঢোল-বাদ্যের তালে, রঙিন মোটিফ আর লোকঐতিহ্যের প্রতীকে ভর করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়-এর চারুকলা অনুষদের সামনে থেকে বের হওয়া ঐতিহ্যবাহী বৈশাখী শোভাযাত্রা সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। এবারের শোভাযাত্রার প্রতিপাদ্য ছিল ‘নববর্ষের ঐকতান, গণতন্ত্রের পুনরুত্থান’।
মঙ্গলবার পয়লা বৈশাখ সকাল ৯টায় জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে শোভাযাত্রা শুরু হয়। এতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ সর্বস্তরের মানুষ অংশ নেন। পুরো ক্যাম্পাসজুড়ে উৎসবের আবহ তৈরি হয়।
শোভাযাত্রায় নেতৃত্ব দেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম। এ সময় উপস্থিত ছিলেন সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরীসহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ও সামাজিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা।
শোভাযাত্রাটি চারুকলা অনুষদ-এর ৩ নম্বর (উত্তর) গেট থেকে শুরু হয়ে শাহবাগ থানার সামনে গিয়ে ইউটার্ন নেয়। পরে রাজু ভাস্কর্য ও টিএসসি প্রাঙ্গণ ডান পাশে রেখে দোয়েল চত্বর হয়ে বাংলা একাডেমির সামনে দিয়ে আবার চারুকলা অনুষদে ফিরে সকাল ১০টা ৫ মিনিটে শেষ হয়।
বরাবরের মতো এবারও শোভাযাত্রায় লোকঐতিহ্য ও বাঙালির স্বকীয়তা বড় পরিসরে তুলে ধরা হয়। বাঁশ, কাঠ ও রঙিন কাগজে তৈরি বিশাল বাঘ, হাতি, ময়ূর এবং মা-শিশুর প্রতিকৃতি অংশগ্রহণকারীদের দৃষ্টি কাড়ে। এবারের মূল বার্তা ছিল অশুভ শক্তির বিনাশ এবং কল্যাণময় ভবিষ্যতের পথে এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান।
শোভাযাত্রায় পাঁচটি প্রধান মোটিফ ছিল— মোরগ, হাতি, পায়রা, দোতারা ও ঘোড়া। এর পাশাপাশি দেখা যায় মাছ, বাঘ ও হরিণ শাবক, ছাগল ও ছাগশিশু, কাকাতুয়া এবং ময়ূরের প্রতিকৃতি।
মোরগ নতুন সূচনা ও আলোর আগমনের প্রতীক হিসেবে অন্ধকার দূর করার ইঙ্গিত দেয়। দোতারা বাঙালির লোকসংগীত ও সাংস্কৃতিক শেকড়ের প্রতিনিধিত্ব করে এবং বাউল শিল্পীদের মর্যাদার বিষয়টি স্মরণ করিয়ে দেয়। কাঠের হাতি শক্তি ও লোকজ ঐতিহ্যের প্রতীক, টেপা আকৃতির ঘোড়া গ্রামবাংলার সরল জীবন ও শৈশবের স্মৃতি জাগায়, আর পায়রা বহন করে সম্প্রীতি ও বৈশ্বিক শান্তির বার্তা।
গণতন্ত্রের পুনরুত্থানের আহ্বানের পাশাপাশি শোভাযাত্রায় অংশগ্রহণকারীদের হাতে ছিল বিভিন্ন প্ল্যাকার্ড ও প্রতীকী শিল্পকর্ম। এসব প্ল্যাকার্ডে পরিবেশ, আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও সামাজিক নানা ইস্যু উঠে আসে।
‘বাঁচাও সুন্দরবন’, ‘ফ্রি প্যালেস্টাইন’, ‘ইরানে মার্কিন যুদ্ধ বন্ধ করো’, ‘গণহত্যাকারীদের রাজনীতি প্রত্যাখ্যান করো’, ‘ফসলের লাভজনক মূল্য দাও’, ‘শিক্ষা বাণিজ্য বন্ধ কর’, ‘মার্কিন বাণিজ্য চুক্তি বাতিল করো’— এমন নানা স্লোগানে মুখর ছিল পুরো শোভাযাত্রা।
উৎসবের মধ্য দিয়ে নববর্ষকে স্বাগত জানালেও শোভাযাত্রাটি ছিল সময়ের বাস্তবতা, প্রতিবাদ ও প্রত্যাশার এক শক্তিশালী প্রকাশ।